
কার্তিকের পূর্ণিমা রাতে জন্মেছিল গমরঙা মেয়ে। প্রথম শ্বাসে পেয়েছিল পারিজাত সুবাস তবুও শঙ্খ বাজেনি বাড়িতে। পরের দিন অরন্ধন। পরিবারের লোকজন ছুঁতে চায়নি গমরঙা শরীর।
যে মেয়ের জন্মের পরে কৈলাস পাড়ি দেওয়াই নিয়তি ছিল, কোন ম্যাজিকে মায়ের বুকের অমৃত টেনে বেঁচে যায় সে। আস্তে আস্তে অবহেলার কাপড়, গনগনে রোদ পেরিয়ে বাড়তে থাকে ঈষদ ট্যারা চোখের শান্ত মেয়েটি। তারপর একদিন জোয়ার আসে। এত দিনের ঘাটে বাঁধা নৌকা টলোমলো। অনুশাসনের ঢেউ ভেঙে কোমর ভেজাতে চায় বয়স। মনের উড়াল আকাশ পেরিয়ে আরও উঁচুতে। এমন সময় কে যেন ডেকে ওঠে কমলা…। পেছনে ঘুরে দেখে বীজ ছড়াতে লাঙল হাতে এগিয়ে আসছে চাষি। মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামে।
তারপর পেরিয়ে যায় অনেকটা সময়। কমলা এখন প্রতিদিন নিয়ম করে শঙ্খে ফুঁ দেয়। সংসারের জন্য ব্রত পালন করে। অভুক্ত পেটে খুঁদ সেদ্ধ করতে করতে স্বপ্ন দেখে গোলাভরা ধান ও বাতাসে ভাতের সুঘ্রাণের। আকাশে ভেসে বেড়ানো পেঁজা তুলোর মতো মেঘ দেখতে দেখতে কমলা উদাস হয়ে যায়। শীর্ণকায় হাতে বেজে ওঠে শাঁখা-লোহা।
জোয়ান নারান আজও ধেনো গিলেছে। আচমকা কমলার মাথায় আঘাত করে লাঠি দিয়ে। উঠোনে পড়ে যায় গমরঙা বউ। মাথা ফেটে গড়িয়ে পড়া রক্তে ভেসে যায় উঠোন।
পরের দিন দেবীর বেশে সেজে ওঠে কমলা। চারিদিকে সিঁদুর পরিয়ে দেবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বেজে ওঠে শঙ্খধ্বনি। উলুধ্বনিতে মুখর হয় পাড়া। কমলা দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে। পেছনে পড়ে থাকে ভরন্ত সংসার। চলার পথে ফুটেছে সহস্র মায়াপদ্ম!

২
কার্তিক পূর্ণিমার রাতে যখন গঙ্গায় যখন ভেসে যাচ্ছিল অসংখ্য মঙ্গলপ্রদীপ ঠিক তখনই কেঁদে উঠেছিল সদ্যজাত শিশুটি। ঠাকুমা ঈশ্বরের কাছে হাতজোড় করে বললেন— ঘরে তুমি প্রদীপ জ্বালালে। রাজলক্ষ্মীর শৈশবটা যেন এক রূপকথা। অভাব কোনোদিন তাদের জানলায় উঁকি দেয়নি। শ্যামবাজার মোড়ে রাজলক্ষ্মীদের কাপড়ের পারিবারিক ব্যবসা, এখন সেটা বাবা দেখাশোনা করেন। লক্ষ্মীমন্ত রাজলক্ষ্মী বুদ্ধিতে ও পড়াশোনায় সেরা। পরশি নিন্দুকেরাও মানতে বাধ্য হতো “গোবিন্দর মেয়েটা যেন সাক্ষাৎ কমলা!”
কিন্তু কার্তিক পূর্ণিমার প্রদীপের আলো একসময় নিভে যায়, থেকে যায় শুধু কালির দাগ। রাজলক্ষ্মীর তেরো বছর বয়সে সেই কালি নেমে এলো পরিবারে। গোবিন্দকে ধরলো মারণ রোগে। খবরটা জানাজানি হতেই চারপাশের চেনা মানুষগুলোর রূপে নেমে এলো অমাবস্যা। যে পিসেমশাই আর কাকা এতদিন রাজলক্ষ্মীর বাবার কাছে ব্যবসার টাকা ধার নিতে আসতেন, তাঁরা দরজা বন্ধ করলেন। জমানো টাকা শেষ হলো চিকিৎসার প্রথম দু’মাসেই। দোকানের মালপত্র বিক্রি করে চলল আরো কিছুদিন। উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি ঘরে মজুত হলো বকেয়া ভাড়ার চিঠি আর ওষুধের দোকানের বিল।
এমনই এক বিষণ্ণ ভাঙা চাঁদ মাথায় ঘরে এসে দাঁড়াল বয়স চল্লিশের এক পুরুষ। গোবিন্দর কাপড়ের লাইনেরই চেনা পাইকারি ব্যবসায়ী। ”গোবিন্দদা এভাবে শেষ হয়ে যাওয়া আমি হাত গুটিয়ে বসে দেখতে পারব না— একদম প্রথম দিনেই অসিতের এই আবেগপূর্ণ কথায় সুচরিতা যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর দিশা পেলো।
অসিত শুধু মুখে আশ্বাস দিল না, কাজেও নামল। দেনা থেকে হাসপাতালের বিল সবটাই মেটালো। এতেই রাজলক্ষ্মীর ছোট্ট পরিবারে অসিত হয়ে উঠল একমাত্র ভরসার জায়গা।
ধীরে ধীরে দুটো বছর কেটে গেল। শয্যাশায়ী গোবিন্দ কথা বলার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়েছে। সংসারে অসিতের যাতায়াত তখন অবাধ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অসিত আসত, বাজারের থলিটা সুচরিতার হাতে দিয়ে বলত, “বৌদি, আপনি এত চিন্তা করবেন না। আমি তো আছি।” রাজলক্ষ্মী তখন পনেরোয় পা দিয়েছে। নবম শ্রেণির পড়াশোনা প্রায় বন্ধের মুখে। অসিত সামনে এলে শামুকখোলে গুটিয়ে যেতো রাজলক্ষ্মী। অসিতের চোখে তখন কামুক তৃষ্ণা।
একদিন কালবৈশাখীর মেঘে ঢাকা সন্ধ্যায় সুচরিতাকে ডেকে অসিত বলল, “বৌদি, গোবিন্দদার শরীর যেদিকে যাচ্ছে, আর আপনার ছোট ছেলেটার তো পড়াশোনা বাকি। এভাবে কতদিন চালাব? আমি রাজলক্ষ্মীকে বিয়ে করতে চাই।” বাপের বয়সি লোকের মুখে এমন কথা শুনে সুচরিতা শিউরে উঠেছিল— “কিন্তু রাজলক্ষ্মীর বয়স মাত্র পনেরো!”
অসিত শীতল হেসে জবাব দিল, “বয়স কোনো বাধা নয় বৌদি। আমি ওকে রাজরানি করে রাখব। আর ভাবুন, ও আমার ঘরে গেলে আপনার ছেলের পড়াশোনা, গোবিন্দদার চিকিৎসা, এমনকী এই সংসারের দায়িত্ব আমার ওপর। আর যদি না চান তবে কাল থেকে কাপড়ের ব্যবসার হিসাবটা আমার বুঝে নেওয়া দরকার।”
এরপর সুচরিতা আর একটা কথাও বলতে পারেনি। ছেলেটা ছোট তাই নিজের আধুনিক চিন্তাভাবনা বিসর্জন দিয়ে অসিতকে আঁকড়ে ধরল। জ্যৈষ্ঠ মাসের এক রাতে সানাই বেজে উঠল। রাজলক্ষ্মী লাল বেনারসি আর গয়নায় সেজেছিল কনের সাজে। বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয়ের যে ছাত্রীটি কদিন আগে বেণী দুলিয়ে ফ্রক পরে স্কুলে যেত সে আজ চলেছে নির্বাসনে নির্বাচিত হয়ে।
বিদায়ের মুহূর্তে রাজলক্ষ্মী মায়ের দিকে পেছন ফিরে ছিটিয়ে দিল কানকাঞ্জলি। ”সব দেনা শোধ করে দিলাম মা”… রাজলক্ষ্মীর ডুকরে ওঠা কান্না বিসমিল্লার করুণ সুরে হারিয়ে গেল।
শহরের সীমা ছাড়িয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে অজানার দিকে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রাজলক্ষ্মী দেখল, কাঁচা রাস্তার চাকার দাগে জেগে উঠেছে ধানের শীষ। মা আর ভাইকে বাঁচাতে এক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী কড়ির দামে কিনেছে তার কৈশোর, এমনকী আস্ত জীবন!

৩
রোজ সকাল হলেই যেন একপ্রস্থ যুদ্ধ শুরু হয় পদ্মার। ঘরের কাজ, রান্না করে গুছিয়ে তবে ধরবে হাসনাবাদ লোকাল। বিধাননগর স্টেশনে নেমে বাস ধরে। পৌঁছতে দেরি হলে কম কথা শোনায় না কাজের বাড়ি। পদ্মা আর মনখারাপ করে না, এসব অভ্যাস হয়ে গেছে। ন’টা বাড়িতে ঠিকের কাজ। এত মান্যি করলে চলবে। পেটের দায়ে কাজ করা, নেহাত দুটো মেয়ের দায়িত্ব কাঁধে। লোকটা থাকলে কি আর এমন হতো। সেই যে ঢাক বাজাতে বের হলো আর ফিরলো না।
দুর্গা পুজো এলে খুব রাগ হয়। মা একেবারে খেয়েই নিল বরটাকে। ট্রেনের জানালার ধারে বসে পদ্মা গুড়াখু মুখে স্বপ্ন দেখে, মেয়েরাও একদিন চাকরি করবে বাবুদের মতো। সংসারের সুরাহা হবে। কিন্তু কিছুতেই তাদের ছোট বয়সে বিয়ে দেবে না। পাশ করে ক্লাসে ওঠার সাথে সাথে খরচটাও বাড়ছে । বড়টার পরের বছর মাধ্যমিক। ছোটটা সাত ক্লাসে। এসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই ট্রেন স্টেশনে ঢোকে।
নেমেই কালুর চোখাচোখি। মেজাজটা গরম হয়ে যায় পদ্মার। এই মিনসেটার সাথেই তো বেরিয়েছিল লোকটা শেষবারের মতো। ঘরে ফিরে মেয়েদের হাঁক দিতেই বেরিয়ে আসে সুজিতদা। একটু গম্ভীর গলায় বলে কী ব্যাপার! এমন অসময়ে, কিছু বলবে। সুজিত আমতা আমতা করে। পেছন থেকে আলুথালু বেরিয়ে আসে বড় মেয়ে। পদ্মার বুঝতে আরকিছু বাকী থাকে না। গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসে আর্তনাদের মতো। লজ্জা করে না, তুই না ওর বাবার বন্ধু। মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় সুজিত।
মেয়ের চুলের মুঠি ধরে কিলচড় মারতে থাকে পদ্মা। তারপর মাথা ধরে বসে পড়ে মেঝেতে। চালের প্যাকেট ফেটে উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লক্ষ্মীর চাল। পদ্মা ভাবতে থাকে কীভাবে সামাল দেবে।***



