
গণেশ আমার বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই। একদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে রোজকার মতোই মা গল্প বলছিল। ছোটবেলার স্মৃতি… ছেঁড়া ছেঁড়া… মনে পড়ে মায়ের স্বর… সুপুরি-এলাচের গন্ধ মেশানো… রূপকথার রাক্ষস-খোক্কস নয়, সেদিন মা বলেছিল দুই ভাইয়ের গল্প। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ব্রহ্মাণ্ড জয় করা নিয়ে। একজনের বাহন ময়ূর। শৌর্য-বীর্যসম্পন্ন দেব সেনাপতি। বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে সেই যোদ্ধা। অন্যজনের বাহন ইঁদুর। চেহারাও বেশ পৃথুল। এই শরীরে সে আগে ব্রহ্মাণ্ড জয় করে ফেলবে, তা আবার হয় নাকি!
কিন্তু তাই হল। কেমন করে? সে নাকি কোত্থাও না গিয়ে নিজের মা-বাবাকে প্রদক্ষিণ করেছিল তিনবার। অথচ শর্ত ছিল তিনবার বিশ্বকে পাক খেয়ে আসতে হবে। দেবসেনাপতি সেটা আক্ষরিক অর্থেই করে ফেলেছিল। তাহলে সে জিততে পারল না কেন? কেননা মা-বাবাই যে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড! জিতে গেল সেই পৃথুল ছেলেটি। যে আসলে আমাদের আরাধ্য দেবতা। গণেশ ঠাকুর। সেই যে ‘গণেশ দাদা, পেটটি নাদা’র সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল, আজও তা অটুট। অবন ঠাকুরের ‘বুড়ো আংলা’য় কথক ঠাকুর মন্ত্রোচ্চারণ করেছিলেন, ‘হেলে শুণ্ড বাড়াইয়া সংসার সমুদ্র নিয়া খেলাছলে করহ প্রলয়’… কিন্তু সেই পুরাণে বর্ণিত বিশ্বসৃষ্টি নিয়ে ছেলেখেলা করা দেবতা তো সকলের। আমার তিনি বন্ধু। মাই ফ্রেন্ড গণেশ। কার্তিকের দেহ নাকি তরুণ সূর্যের মতো। এমন মানুষকে বন্ধু ভাবা কঠিন। দেবসেনাপতি থাকুন তাঁর জায়গায়। আমি গণেশকে দেখি। তাঁকে খুঁজি। ‘অজম নির্বিকল্পম নিরাকারমেকম’কে খুঁজে পাওয়া কি সহজ? তবু… মানুষের মাঝেই দেবতা আসেন। দেখা হয়ে যায়।

বহুবছর আগের কথা। কলকাতা বইমেলায় এক বিখ্যাত গায়ককে তাঁর অনুরাগী বলেছিলেন, ‘দাদা, চেহারাটা বড্ড খারাপ দেখাচ্ছে। শরীর ভালো তো?’ কথাটা শুনে তিনি কার্যতই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। সটান বললেন, ‘মানুষের চেহারা দেখে সব বোঝা যায়? হ্যাঁ, মেদ বাড়ছে ঠিকই। কিন্তু আমার চর্চা, পড়াশোনা সেসবও তো আছে।’ তারপর মাথায় টোকা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা এসবকে অতিক্রম করে এটা নিয়ে ভাবো না কেন? এটাই তো আসল।’ তাঁর দেওয়া টোকায় আমি দেখতে পেয়েছিলাম মগজের ভিতরের ‘লিটল গ্রে সেলস’ কীভাবে নড়াচড়া করে উঠছে! মানুষের জ্ঞান, প্রজ্ঞাই তাঁর আসল সত্তা। শরীরী সৌন্দর্যের সীমা আছে। কিন্তু জ্ঞানপিপাসার কোনও শেষ নেই। আর সেই জ্ঞানই তাঁকে অনন্তের কাছে নিয়ে যায়। গণেশের আসল শক্তি সেই জ্ঞানের অর্জনেই। কিন্তু বাইরে থেকে বোঝা যায় না যে! কার্তিকের চেহারাটা ভাবুন। পাতলা গোঁফ, ছিপছিপে চেহারা, অস্ত্রধারী সুপুরুষ। গণেশ দাঁড়িয়ে তার ঠিক বিপরীতে। অথচ তিনিই তো আমাকে শেখালেন ব্রহ্মাণ্ডকে কীভাবে প্রদক্ষিণ করা যায় ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই!
গণেশ যেন ভিড়ের মাঝে মিশে থাকা এক মানুষ। যিনি দূর থেকে বহুকিছু দেখেন। কিন্তু বুঝতে দেন না। আজকের জিমচর্চিত, ট্যাটুশোভিত, ছুঁচলো দাড়ির ছিপছিপে তরুণদের ভিড়ে এই ‘ক্যামোফ্লেজ’ আরও সহজ হয়। তবু তাঁর সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হয়ে যায়। মনে আছে, খুব ছোটবেলায় কোজাগরী লক্ষ্ণীপুজোর দিনের কথা। বাড়ির পুজো হয়ে যাওয়ার পরে মায়ের আঁকা মা লক্ষ্মীর ছোট ছোট পায়ের ছাপ আমাকে এক অলীক প্রতীক্ষার দুনিয়ায় নিয়ে যেত। আবার সরস্বতীর শুভ্র বসনের ভিতরে রয়েছে অন্যতর প্রশান্তি। হাতের বীণার ঝংকার মনে মনে আমাদের সরিয়ে নিয়ে যায় চর্চার নিবিড় মননে। গণেশ সেখানে বন্ধুর মতো পাশে হাঁটেন।
আমাদের পাড়ায় দেবেনমামার সেলুনের কথা বলি। তখন আমাদের পাড়ায় একটাই সেলুন। সকলের সেখানেই যাতায়াত। আমাকেও বাবা নিয়ে যেত। বেজায় রাগী দেবেনমামার হাতে চুল কাটা… সে এক শাস্তি! ঘাড় একটু নাড়ালেই ধমক। মাথা একটু ঘুরিয়ে ফেললেই ধমক। চুল কাটার সময় হঠাৎ নাক চুলকে ফেললেই ধমক, ‘অ্যাই! এরকম নড়াচড়া করলে কিন্তু কানটা কেটে যাবে কুচ করে।’ এহেন রাগী লোকটার লোকটার কুলুঙ্গিতে একটা গণেশের মূর্তি থাকত। ছোট থালায় গুজিয়া আর ছোট গেলাসে জল। মাথার উপরে একটা জিরো পাওয়ারের নীল বাল্ব। এই দেবেনমামার গণেশের সংসার। বিঘ্নহর্তা সেখানে বসেই আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আমি ধমকের ভয়ে শক্ত হয়ে বসে আছি। মাথার চুল ঝরে পড়ছে সাদা চাদরে। আমার চোখ চলে যাচ্ছে গণেশের দিকে। তিনি কি সেই সময় কিছু বলতেন? ‘তিনি’ না বলে বরং ‘সে’ বলি। গণেশ যে আমারই বন্ধু। সে কি কিছু বলত? না। তবে তার ওই স্থির, শান্ত ভঙ্গিই যেন আমার মধ্যে বয়ে যেত। দেবেনমামার রাগ ও আমার অস্থিরতার মাঝে সেতু গড়ে তুলত আমার ‘ফ্রেন্ড’। শেখাত ধৈর্য ধরতে। শেখাত সময়ে সময়ে কীভাবে স্থির থাকাতেই সিদ্ধিলাভ হতে পারে।

এবার চলে যাই তমালদার কোচিংয়ে। পাড়ার জনপ্রিয় অঙ্ক স্যার। কোনও এক পয়লা জানুয়ারি স্যারের বাড়িতে পিকনিক। তখন এসব প্রায়ই হত। তা সেদিন এক নয়, একাধিক কার্তিকের ভিড় তমালদার বাড়িতে। আর সকলের চোখের সামনে একটিই মেয়ে। তাকে দেখে গোটা কোচিং ‘ফিদা’। কিন্তু কার্তিকের দল চাইছে মেয়েটির ‘নিজস্ব ময়ূর’ হতে। শুরু হল গানের আসর। একেকজন করে গান গাইছে। মেয়েরাও গাইছে বটে। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে উৎসাহ বেশি। সব হৃতিক রোশনের দল। গলায় কুমার শানু, উদিত নারায়ণ। আসর যখন শেষের দিকে, হঠাৎই গান গাইল তাপস। একেবারে কোনায় বসা পৃথুল যে কিশোর বলিয়ে কইয়েদের ভিড়ে চিরকাল ‘অদৃশ্য’, সে সেদিন আচমকাই গেয়ে উঠল। শানু-উদিতদের সরিয়ে রেখে জগজিৎ সিং। হোঁটো সে ছুঁলো তুম। কার্তিক তো বটেই লক্ষ্মী-সরস্বতী, মায় ইন্দ্র-বরুণ গোটা রাজসভার চোখ ছানাবড়া। তাপস গাইছে? আজকের দিন হলে এআই কিনা, সেকথা উঠতেও পারত! ভিড়ের ভিতর থেকে দেখেছিলাম আচমকাই এক শান্ত ছেলে কী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল! গানের প্রতিটা লাইনকে সে হাতে ধরে পরম যত্নে ভাসিয়ে দিচ্ছি আমাদের সামনে। যেন বুদবুদওয়ালার রঙিন বোতল থেকে বেরিয়ে আসছিল স্বপ্নসদৃশ চেতনাগুচ্ছ! না, রূপকথার গল্পের মতো সেই মেয়েটির সঙ্গে তাপসের প্রেম-টেম হয়নি। কিন্তু সেদিনের সেই বর্ষবরণের সন্ধ্যায় সবটুকু আলো একাই কেড়ে নিয়েছিল তাপস। মেয়েটির চোখে ছিল আশ্চর্য মুগ্ধতা। সহপাঠী থেকে বন্ধু হয়ে ওঠা তাপস আমাকে সেদিন শিখিয়ে দিল, শান্ত থাকো। অপেক্ষা করো। তারপর সঠিক মুহূর্তে ধনুকের ছিলার টানে সপাট বিঁধে যাও লক্ষ্যস্থলে।
আমাদের সমাজে ঘোরতর সব স্টিরিওটাইপ আছে। একটু ভারী চেহারা মানেই বোকা, বুঝভোম্বল মার্কা ধরে নেওয়া হয়। বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা আর চোখাপনা নাককে এক ধরে নিই আমরা। আর ভুল করতে থাকি। গণেশ বোঝায়, ভালো করে দেখো। মাথার মধ্যে ভরে রাখো সব। স্টিফেন হকিং যেমন। শরীর নড়ছে না। সব স্নায়ুর সুতো কে যেন বেঁধে রেখেছে অন্যত্র। তবু চেতনা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনন্ত শূন্যে। সময় ও স্পেসের গায়ে ঠোক্কর মেরে ‘দূরে কোথাও, দূরে দূরে…’ অস্তিত্বের গভীরে জ্ঞানের সমুদ্রের ঢেউ ঠেলে ঠেলে মানুষের এগিয়ে যাওয়া।
গণেশ মানুষের হাত ধরে রেখেছে। বহিরঙ্গ যা খুশি হোক। অন্তরঙ্গে বাড়িয়ে দাও জ্ঞানপিপাসার প্রকাণ্ড শুণ্ড। রোজকার জীবনে গণেশকে আমি রোজই দেখি। রোজ মানে প্রত্যেক দিন নয়। তবে প্রতিটি জরুরি মুহূর্তেই… সেই যে হিন্দি ছবিটা ‘মাই ফ্রেন্ড গণেশ’, সেই ছবির প্রোটাগনিস্ট বাচ্চার মতোই, আমি বা আমরা প্রত্যেকে-সকলে গণেশের বন্ধু। কখনও কুলুঙ্গিতে, কখনও অটোর পাশের সিটে, কিংবা অন্যত্র… গণেশ এসে বসে থাকে। বন্ধুর মতো। দার্শনিকের মতো। পথপ্রদর্শকের মতো। আমার সেই ‘ফ্রেন্ড-ফিলোজফার-গাইড’ গণেশ। আমার বন্ধু গণেশ। ‘বন্ধু রহো রহো সাথে’।***



