A prose about Goddess Dura by Arthita Mandal

ঘরের মেয়ে দুগ্গা—অর্থিতা মণ্ডল

A prose about Goddess Dura by Arthita Mandal

বর্ষা শেষ হয়ে এলে। বড়ো চেনা রোদ উঠোনে ছড়িয়ে পড়া শিউলি ফুলের গায় আঁকিবুকি কাটে। কাঁসাই নদীর ধারে তখন কাশেরা ঘন হয়। দেখতে দেখতে আশ্বিন এসে গেলে শিউলি ফুলের গন্ধ ছাপিয়ে গাঢ় হয়ে আসে মা মা গন্ধ। আমি তখন মায়ের গায়ের গন্ধের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি দুর্গা মায়ের সুঘ্রাণ। মাতৃপক্ষ শুরু হয়, দুর্গা মায়ের মুখ স্নেহ বিলিয়ে কাছে ডাকে। এমনই এক চতুর্থীতে জন্ম আমার, মনে হয় দুর্গামা আমার মা হয়ে আগলে রাখেন। ছোটবেলায় মা বলতেন, ‘দুর্গা মায়ের তিন নম্বর চোখ জ্বলে ওঠে যখনই কেউ অন্যায় করে। বড্ড রেগে যান তিনি।’

যেখানেই যখন অন্যায় ঘটে, এই পৃথিবীর আনাচে-কানাচে মা দুর্গার চোখ আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে। সেই ছোটোবেলায় ধর্ম কী না বুঝলেও ৯২-এর হত্যালীলার পরে ৯৩তে যেদিন মা দুর্গা এসেছিলেন, সেদিন তাঁর চোখে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা দেখেছিলাম। মা বলেছিলেন,‘মা দুর্গার মতো সাহসী হও।’ মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গা মায়ের ঢল ঢল মুখ কখন যে জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে মিশে যায় টের পাইনি আজও। পুষ্পাঞ্জলির ফুল হাতে, পুরুত ঠাকুরের মন্ত্র নয়, কতবার যে বলেছি ‘মা তুমি ভালো থেকো, ভালো রেখো।’ সেই ধূলোমাখা ছোটোবেলায় পুজোর আনন্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুষ্টুমি বাড়লে মা দুর্গার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারতাম, দুর্গামা বুঝে গেছেন সব। মৃণ্ময়ী মায়ের মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। ঠিক যেভাবে শাসন করার সময় মায়ের রেগে ওঠা মুখের ভেতর লুকিয়ে থাকত স্নেহ-প্রশ্রয়ের হাসি! মহালয়ার ভোর আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা, দূরদর্শনে দেবীমায়ের ‘যুদ্ধং দেহি’ রূপ কানে কানে বলে যায়, এখনও বলে ‘মা আসছেন।’ পৌরাণিক মতে মা হিমালয়ের কন্যা আর আমাদের কাছে মা যে আমাদের ঘরের মেয়ে উমা।

টেপ রেকর্ডারে যখন বেজে উঠত ‘গিরি, এবার উমা এলে আর উমা পাঠাব না, বলে বলবে লোকে মন্দ, কারও কথা শুনব না।।’ তখন রামপ্রসাদী সুর আমাদের প্রবাসী মায়ের বাড়ি আসার আনন্দকে উজ্জ্বল করে তুলতো। আজও তো তাই। মা আসবেন বলে পুজোর সাজ আর অপেক্ষা জুড়ে উৎসবের আমেজ। মায়ের বুকের ওমের মতো দুর্গা মায়ের শান্ত স্নিগ্ধ ভালোবাসা বাড়ি ফিরে আসা আপনজনটির মতো জড়িয়ে রাখে।পাড়ার মণ্ডপের কাছেই মূর্তি গড়েন শিল্পী। একটু একটু করে মাটির পরতে রঙ পড়ে, মৃণ্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে ওঠার সময় এগিয়ে আসে।

আমি সেভাবে কখনো বাড়ির পুজো দেখিনি। একবারই কিছু মুহূর্তের জন্যে একটি বাড়ির ঠাকুর দালানের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। দালানে মা দুর্গা তাঁর পরিবার নিয়ে, সামনে সাজানো নৈবেদ্য, পুরোহিতের মন্ত্র আর ধূপ-ধুনোর গন্ধ, গৃহস্থ বাড়ির সদস্য, আত্মীয় স্বজনে মুখরিত, মনে হচ্ছিল বসে থাকি সবকিছু ভুলে। অনন্ত সময় কেটে যাক ক্ষতি নেই। সমস্ত দালান জুড়ে মায়ের উপস্থিতি। মা যেন কথা বলেন মনে মনে। চারদিকে সাজসাজ রব আর ব্যস্ততার ভেতর বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল বাড়ির মেয়ে এসেছেন এক বছর পরে। বাড়ির আদরের মেয়েটি তাঁর সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে অনেকদিন পরে ঘরে এলে এমনটাই তো হওয়ার কথা। ঠিক একইভাবে ১৯৯৮ সালে জঙ্গল মহলের একটি গ্রামের পুজো দেখেছিলাম। সেই ঘরোয়া আবহে দুর্গামা যেন দশ হাতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রাকৃতিক নিস্তব্ধতারএক আন্তরিক ঔজ্জ্বল্য। আরণ্যক শিশুদের সারল্যে কী যে গভীর আকুতি, যা মা দুর্গার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

এই ঘটনার অনেক বছর পরে সার্ভে করার প্রয়োজনে অরণ্যবেষ্টিত গ্রামে গ্রামে ঘুরতে গিয়ে পায়রাকুমারী, গুপ্তমণি, জয়চণ্ডীর মতো থান/ মন্দিরে দেখেছি দেবী দুর্গার লৌকিক রূপ। জাতপাত ছোঁয়াছুঁয়ির বাইরে দাঁড়িয়ে অব্রাহ্মণ পুরোহিতের মাধ্যমে পুজো গ্রহণ করে আরণ্যক জীবনে সেই ঘরেরই মেয়ে হয়েই আছেন তিনি। ঘরের মেয়ে বলেই তো দুর্গাপুজোর সময় মা দুর্গার কাছে আনন্দে মেতে ওঠেন মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ-সহ নানা ধর্মের মানুষেরা, এমন কী বাঙালি ছাড়াও অন্য ভাষাভাষির মানুষেরাও এই আনন্দে সামিল হন। বাঙালি আটপৌরে মা, যেমনভাবে সবার সন্তানকেই আপন করে নেন, তেমনই এই চিন্ময়ী মাও তাঁর সব সন্তানকে কাছে টানেন বড়ো মায়ায়, গভীর স্নেহে।

সন্ধিপুজোর লগ্নে প্রদীপের আলোর মধ্যে কী অদ্ভুত এক মায়া থাকে। ওই আলোয় যখন মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তখন সেই আলোর ছোঁয়া লাগে মনে। সমস্ত অশুভর ভেতর শুভর বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবারই ওই সন্ধি মুহূর্তে ওই তেজময়ীর তেজ নাড়িয়ে দিয়ে যায় সমস্ত শরীর, মন। কী যেন এক প্রতিশ্রুতি আমার মনের ভেতরটাকে নাড়িয়ে দিয়ে তোলপাড় করে বলে ওঠে রক্ষা করো, আগলে রাখো। তখনই অনুভব করি আমার মা যেমন আগলে রেখে পরিবারের সবটুকু অশুভকে দূরে ঠেলতে চান, দেবীমাও দুহাতে সরিয়ে দিতে চান অশুভকে। আমার বারবার মনে হয়, সেই শক্তি জেগে ওঠে আমার ভেতরে, আমাদের ভেতরে। এই যে নারীদের অপমান, নির্যাতন, এই যে পুরুষদের উপর নির্বিচার অত্যাচার লীলা, এই যে প্রতিটা দিন শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে যেখানে সেখানে, এই যে বৃহন্নলারা মানুষ হিসেবে গন্য হতে হতেও হচ্ছেন না, এইসব মুহূর্তে মনে হয়, দুর্গাপুজোর আলোর ভেতর বিশেষত সন্ধিপুজোর মুহূর্তে মা দুর্গার ভেতরের যে অসুরদলনী শক্তি তা যেন সচেতন মানুষের ভেতর আরও একবার ঢুকে যায়। মা-ই তো সন্তানদের ঠিক রাস্তাটা দেখান। দুর্গার দুর্গতিনাশিনী মূর্তিতে এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা যাক আবারও।

কেউ বাইরে বেরোলে, দিদিমা বলতেন ‘দুর্গা দুর্গা’। মাও বলেন মনে মনে। দুর্গা নামটাই মিশে থাকে আমাদের রোজের যাপনে, জীবনচর্চা এবং চর্যায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,‘দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই প্রিয়জনে-/ প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই তাই দিই দেবতারে; আর পাব কোথা!/দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা!’(বৈষ্ণব কবিতা) দুর্গাপুজো এলে, দুর্গামায়ের দিকে তাকালে এই পঙক্তিই বারবার ধ্বনিত হয়। সেই কতকাল ধরে বাঙালি দুর্গাকে ঘরের মেয়ে করে নিয়েছেন। পৌরাণিক দেবীর ধর্মীয় বাতাবরণের বাইরে দাঁড়িয়ে মা দুর্গা প্রতিটি বছর ফিরে ফিরে আসেন আমাদের মা হয়ে, বাড়ির মেয়ে হয়ে। তাই তো দশমীতে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে আমাদের অন্তরের ভালোবাসায় তাঁর চোখ ছলছল করে ওঠে। বাঙালি মেয়ের বিবাহের পরে প্রথমবার শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময়ের কনকাঞ্জলি, মা দুর্গার বিদায় মুহূর্তের কনকাঞ্জলির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। দেবী যেন কামনা করেন, তাঁর পিতৃগৃহ এই পৃথিবী শস্য-শ্যামলা থাকুক।

আমার জন্মদাত্রী মা আর জগজ্জননী দুর্গা মাকে কখনও কি আলাদা করে ভাবতে পারি! ভালো থেকো, ভালো রেখো- সন্তানের এই চিরন্তন কামনা নিয়ে মা দুর্গা আসেন আমাদের অন্তরে, আমাদের ঘরে, বাঙালির উৎসবের আঙিনায়। ***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top