
কাশ ফোটার অনেক আগেই আমাদের গাঁয়ে আগমনীর বার্তা নিয়ে হাজির হত নিরাপদ পটুয়া। ভাদ্রের তালের গন্ধ তখনও বেশ ভারী। ক্লাবের দালানে বাঁশ পড়ত। নিরাপদ অতি যত্নে সেই বাঁশ ফেড়ে পেরেক ঠুকে কাঠামো বানত। এরপর বিচালি ও সুতলির শক্ত বাঁধনে সপরিবারে উমার আদল। পাড়ার ছেলেরা ভিড় করে দেখত নিরাপদ-কারসাজি। পাশেই তাসের আড্ডায় কাকা-খুড়োর দল। ধাপে ধাপে মাটি মাখত উমা। ভেজা খড় আর মাটির অদ্ভুত সেই ঘ্রাণে ম-ম দশদিক। কালচে ভাব কেটে এক সময় ধবধবে হয়ে ওঠে মেঘ। ঘন নীল আকাশের নিচে মাঠ পুকুর খাল ভরে ওঠে নীল-সাদা-লাল শাপলায়। কাশের বনে ঢেউ লাগলেই বুঝতে পারতাম, নীলাকাশ ফুঁড়ে মা আসবেন ক্লাবের দালানে নিরাপদর হাতে গড়া মাটির মায়ায়।
গাজন খেলতে খেলতে রাজুর হাতের নাগাল পেরিয়ে প্রথম কোট পার হয়ে ফটিক বলে, “হাঁ রে টুকাই দুর্গাপুজায় তো সারা দেবদেবী স্বর্গ দিয়া মর্তে আইসে। কার্তিকের বউও আইসে। তাহলে গণেশের কলাবউকে কি স্বর্গে রইতে দেয়নি?” টুকাই ভ্রূ কুঁচকে বলে, “কেনি সেও তো স্বর্গ দিয়াই আইসে।” অতি বিজ্ঞের মতো ফটিক বলে, “না। পূজার আগে পুরুত ঠাকুর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু কলাবউ তো গাছ। তার তো আগে দিয়া প্রাণ রইছে। আমার মনে হয় কী জানু, গণেশ এউখানে তার বউয়ের সঙ্গে দেখা করতে আইসে।” ফটিকের এই সরল বক্তব্যেই লুকিয়ে আমাদের দুর্গাপুজোর আসল দর্শন। মা-ঠাকুমারা ছেলে ভোলাতে কলাবউকে গণেশের বউ হিসাবে দাগিয়ে দিলেও, কলাবউ আসলে মা। এই বাংলার সুজলা সুফলা প্রকৃতির প্রতিমূর্তি।

সপ্তমীর ভোরে পুরুত ঠাকুর নিজে ছুটতেন কলাগাছের খোঁজে। পিছনে দল বেঁধে ছুটতাম। দিনের প্রথম ঝিম ধরা আলোয় শিশির মাড়িয়ে পৌঁছতাম ক্যাবলাদের বাগানে। ভোরের বাগানে অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ! শিশির ভেজা মাটি, দূব্বা ঘাস আর প্রথম আলোর প্রেমালাপ। নিশ্ছিদ্র সেই নীরবতা খানখান অবোধ্য মন্ত্রে। শাবলের ত্যেড়ে উঠে আসে গণেশের সঙ্গে মানানসই কলাবউ। আগামী চার দিন তিনি আমাদের পূজ্য দেবী। কলাবউ একা নন। তার সঙ্গে ডোবার পাড়ের কচু, রান্নাঘরের পিছনের হলুদ গাছ, অশোক-ডালিম-জয়ন্তীর ডাল, বেলপাতা, নতুন ধান এবং বুনো ঝোপে অনাদরে বেড়ে ওঠা মানকচু। ‘নবপত্রিকা’ এসে হাজির ক্লাবের দালানে। যেন স্বর্গের দেবীর সঙ্গে বাংলার মাটি-জলার আলাপ! স্বর্গ ও মর্তের সুখ-দুঃখের কত গল্প চার দিন। দুর্গার কাছে হয়তো-বা রাশি রাশি অভিযোগ যেত মর্তের দেবীর থেকে। পুরুত ঠাকুর মন্ত্র পড়ে কলাবউকে শাড়ি পরান। লাল পাড় সাদা শাড়িতে সেজে ওঠেন মর্তের দেবী। মায়ের তখন দুই রূপ। এক রূপে মাটির প্রতিমা। অন্য রূপে জীবন্ত প্রকৃতি।
বিকেলগুলো কাটত বাদুড়ঝোলা হয়ে। বাবলাদার প্যান্ডেলে বাঁশে কত রকম ভেলকি। বাঁশ বেয়ে প্যান্ডেলের চূড়ায় উঠে আমরাই তখন রাজা-বাদশা। মাইকে বাজছে, ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি’। আমাদের অবশ্য গল্পের ফুরসত নেই। কত রংবেরঙের খেলা। পিট্টু, বুড়ি বসানো, গাজন, কুমিরডাঙা, গুলি, লাটিম। পিছনের বাগানে দলবেঁধে ডাব চুরি। কচি শাঁসওয়ালা অন্তত সাত-আটটি ডাব নিমিষে শেষ করে ভালো ছেলেটি হয়ে বাড়ি ফিরতাম। সন্ধে নামলে জেনারেটরের ভটভট শব্দে আলো জ্বলত প্যান্ডেলে। ক্লাবের সিলিংয়ে সপরিবারে বাস লক্ষ্মীপেঁচার। পুজোর চারটে দিন ওদের জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। গভীর রাতে ঠাকুর দেখার ভিড় যখন কমে আসত তখন প্যান্ডেলের ভেতর দিয়ে দুর্গার কাঁধে গিয়ে বসে মর্তের লক্ষ্মীর বাহন। মুখে তার গেছো ইঁদুর। গণেশের চোখের সামনে দিয়ে তার বাহনকে মুখে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়ে যেন সদর্পে গলা তুলে ঘোষণা দিত, ওসব নিয়মকানুন এখানে খাটবে না। বেচারা গণেশ! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখত। পুজো উপলক্ষে গোটা গ্রাম যেখানে নিরামিষাশী, সেখানে এই আমিষাশী জীবের কর্মকাণ্ডে, তিন দিনের উপোসী পেটে চোখের সামনে ভাসত বিরাট কাঁসার থালায় লাল চালের ভাত, শোলপোনার চচ্চড়ি আর কাঁচা তেঁতুল দিয়ে চিংড়ি টক।

নবমীর দুপুরে সন্ধিপুজোর পর বলি হয়। কলাগাছের গোড়া কেটে তৈরি হত হাড়িকাঠের আদল। বিরাট খড়্গের একেক কোপে কাটা পড়ে চালকুমড়ো, আখ আর কলা। ঢাকের শব্দ ও ধুনোর গন্ধে প্যান্ডেলের মধ্যের আবহ তখন মহিষ বলির। ফটিককে একদিন বলেছিলাম, “কৈলাসে ফেরার সময় দুর্গা এই চাল-কুমড়া সঙ্গে নিয়া যায়। সেখানে শিবের জন্য তরকারির বড়ি বানায়। কৈলাসে তো বরফ। তাই চালকুমড়া, আখ, কলা এইসব সেখানে হয়নি।”
নবমী শেষ হলে এক বিরাট বিষাদের মেঘ। সে দুঃখ মানুষের সঙ্গে দাগ কেটে যায় প্রতিটি প্রাণ, জড়বস্তু এমনকী পুকুরপাড়ের ছোট্ট ফড়িংটির গায়ে। বরণপর্ব সেরে সপরিবারে মাকে বিসর্জন দেওয়া হবে বেতনি নদীতে। মাথায় ফেট্টি কপালের সিঁদুর টিকা লাগিয়ে পান্নাকাকা চেঁচাচ্ছেন, ‘বলো দুগ্গা মাইকি…’। ঝিম ধরা আলোয় মুখ থুবড়ে জলের উপর পড়েন দুর্গা মহিষাসুর সরস্বতী গণেশরা। বিষণ্ণ মনে ক্লাবে ফিরে দেখি কাপড়ে মোড়া ‘কলাবতী’ ঘোমটার আড়ালে কাঁদছেন। স্বর্গ-মর্তের বাধন ছেঁড়া কান্না। পরদিন তাকে সযত্নে বাড়ি নিয়ে যান ঠাকুরদা। পুকুরপাড়ে জায়গা হয় তার। কতকালের ঘোমটা খুলে উন্মুক্ত নির্লজ্জ শরীরে সে বেড়ে ওঠে তরতরিয়ে।
এক একটা পূর্ণিমার রাতে তার শরীরে ঠিকরে পড়ে চাঁদের আলো। স্বর্গ-মর্তের মাঝে এক দীর্ঘ আলোর সিঁড়ি। যাকে বেয়ে এক্ষুনি চলে যাওয়া যায় দুর্গার বাড়ি। যেখানে ময়ূরের পিঠে বসে তির-ধনুকে কাঠবিড়ালি শিকার করছে কার্তিক। বর্ষার দুপুরে কলাবউয়ের নগ্ন পাতায় ফড়িং বসে। দুপুর রাতে পায়ের কাছে ঘুরঘুর করে জোনাকির দল। কলা বউকে ঘিরে একেক রাতে স্বর্গ নেমে আসে এই মাঠ, বন, জলার ধারে।***



