কবি মাত্রই ভাষার ‘শত্রু’, প্রতিটি কবিতা ঐশ্বরিক নাদ—বাসুদেব মণ্ডল

কবিতা আসলে কোনও ব্যাকরণ-সিদ্ধ জ্যামিতিক রেখা নয় যে তাকে একটি বিন্দু থেকে শুরু করে অন্য বিন্দুতে গিয়ে শেষ করতে হবে। আমি যখন কবিতার গহন অরণ্যে প্রবেশ করি, তখন দেখি সেখানে প্রথাগত সরল বাক্যের কোনও স্থান নেই, কারণ কবিতা তো কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, তা হল আত্মার এক অবিনাশী চিৎকার। এই প্রবন্ধে আমি আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোয় শব্দের সেই শৈল্পিক উচ্চারণকে ব্যবচ্ছেদ করতে চাই, যেখানে বাক্যের সমাপ্তি ঘটার চেয়ে তার অন্তহীন অনুরণন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমি বিশ্বাস করি, কবিতা যখন পৃষ্ঠার ওপর শরীর ধারণ করে, তখন সে ভাষার চিরাচরিত শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করার এক সুগভীর সাহস নিয়ে আসে।

সহজাতভাবেই মানুষের আবেগ যখন তীব্রতর হয়, তখন সে আর সুশৃঙ্খল গদ্যে কথা বলতে পারে না; তার স্বর হয়ে ওঠে কম্পিত এবং বাক্য হয়ে পড়ে খণ্ডিত। আমি মনে করি, এই খণ্ডিত রূপই হল কবিতার আসল অলংকার, যেখানে কবি সচেতনভাবেই ব্যাকরণের নিয়মগুলোকে বিসর্জন দেন। আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনক ফার্দিনান্দ দ্য সসুর যখন শব্দের ‘চিহ্নক’ এবং ‘চিহ্নিত’ সত্তার কথা বলেছিলেন, তখন তিনি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু কবিতায় এসে সেই চিহ্নকগুলো যেন তাদের নির্দিষ্ট কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে এক ধরণের নাক্ষত্রিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। শৈল্পিক উচ্চারণ মানেই হলো শব্দের সেই আদিম এবং বুনো রূপকে ফিরিয়ে আনা, যা কোনও যুক্তির নিগড়ে বন্দি নয়।

অন্বয় বা বাক্যের পদের শৃঙ্খলাকে যখন কবি ভেঙে ফেলেন, তখন তিনি আসলে এক ধরণের ‘কাব্যিক নৈরাজ্য’ তৈরি করেন যা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। আমি যখন রুশ রূপবাদী তাত্ত্বিক ভিক্টর শক্লোভস্কির ‘ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন’ বা ‘অপরিচিতকরণ’ তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করি, তখন বুঝতে পারি কেন কবিতায় প্রথাগত বাক্যের সমাপ্তি কাম্য নয়। শক্লোভস্কি বলেছিলেন যে, শিল্পের কাজ হল কোনও বস্তুকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে পাঠক তাকে নতুনভাবে দেখতে বাধ্য হয়। একটি সরল বাক্য যখন আমাদের চিরচেনা পথে হাঁটে, তখন আমাদের মস্তিষ্ক অলস হয়ে পড়ে, কিন্তু সেই বাক্যটিই যখন মাঝপথে থমকে যায় বা তার পদের বিন্যাস ওলটপালট হয়ে যায়, তখন আমাদের চেতনা এক ধরণের ধাক্কা খায়। এই ধাক্কাই হল কবিতার শৈল্পিক সার্থকতা।

নির্মাণশৈলীর বিচারে আমি দেখি, কবিতা হল ভাষার ওপর এক ধরণের ‘শৈল্পিক জুলুম’, যা ভাষাকে তার প্রাত্যহিক ব্যবহারের গণ্ডি থেকে টেনে বের করে আনে। টি. এস. এলিয়ট যখন তার ‘অবজেক্টিভ কো-রিলেটিভ’ তত্ত্বের কথা বলেছিলেন, তখন তিনি আসলে এমন এক সংবেদনার কথা বুঝিয়েছিলেন যা কেবল শব্দ বা বাক্যের মাধ্যমে নয়, বরং এক ধরণের সামগ্রিক আবহ তৈরির মাধ্যমে অর্জিত হয়। আমি যখন কোনও সফল কবিতা পাঠ করি, তখন দেখি সেখানে বাক্যটি শেষ হল কি হল না, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সেই শব্দের প্রক্ষেপণ যা আমার মনে একটি স্থায়ী চিত্রকল্প তৈরি করে দেয়। এখানে শব্দের উচ্চারণই হল শেষ কথা, যেখানে প্রতিটি ধ্বনি তার নিজস্ব ওজনে দাঁড়িয়ে থাকে।

বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের মতো কবিতাও একটি ক্ষুদ্র শব্দের মধ্যে মহাবিশ্বের ভার বহন করতে পারে। আমি যখন ইমেজম বা চিত্রকল্পবাদী কবিদের ইশতেহার পড়ি, তখন দেখি এজরা পাউন্ড পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন যে, একটি অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করা মানেই হল কবিতার শিল্পগুণকে হত্যা করা। এই তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে আমি বলতে পারি যে, প্রথাগত ব্যাকরণ মেনে বাক্য বড় করার চেয়ে একটি সার্থক ইমেজের জন্য বাক্যকে পঙ্গু করে দেওয়া অনেক বেশি শৈল্পিক। বিদেশি সাহিত্যের ইতিহাসে এই যে বাক্যের শরীর ব্যবচ্ছেদ করার প্রবণতা, তা আসলে সত্যকে আরও নগ্নভাবে দেখার এক ব্যাকুল প্রচেষ্টা মাত্র। বাক্য যেখানে তার আভিধানিক ভারে নুয়ে পড়ে, শব্দ সেখানে তার ডানা মেলে দিতে চায়।

চিন্তার এই প্রবাহে যখন আমি ডুব দিই, তখন ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের অবদানের কথা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। ম্যালার্মে বা র‍্যাঁবো যখন ভাষার প্রচলিত ব্যবহারকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তখন তারা আসলে শব্দের সঙ্গীতময়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ম্যালার্মে তো মনে করতেন যে, কবিতা লেখা মানেই হল সাদা কাগজের শূন্যতার ওপর এক ধরণের আক্রমণ চালানো। সেখানে বাক্য গঠনের চেয়ে সাদা স্থানের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। আমি মনে করি, এই শূন্যস্থানগুলোই হল কবিতার সেই বাক্য যা কখনও লেখা হয় না, অথচ পাঠক তার হৃদস্পন্দন দিয়ে তা অনুভব করতে পারে। শব্দের শৈল্পিক উচ্চারণ এখানে কেবল কণ্ঠের নয়, বরং এক ধরণের নৈঃশব্দেরও উচ্চারণ।

যুক্তি দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, কবিতা হল ভাষার এক চরমতম স্বাধীনতা। আই. এ. রিচার্ডস যখন কবিতার ভাষাকে ‘ইমোটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা আবেগীয় ভাষা বলেছিলেন, তখন তিনি আসলে বৈজ্ঞানিক ভাষার সাথে কবিতার ভাষার এক মৌলিক পার্থক্য গড়ে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের ভাষা যেখানে একটি নির্দিষ্ট তথ্যের দিকে নির্দেশ করে, কবিতা সেখানে অসংখ্য ইঙ্গিত বা সাজেশনের দিকে পাঠককে নিয়ে যায়। আমি রিচার্ডসের এই যুক্তির পথ ধরে বলতে চাই যে, যদি কোনও বাক্য নিয়ম মেনে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়, তবে তা একমুখী হয়ে পড়ে। কিন্তু কবিতা যেহেতু বহুমাত্রিক এবং তার অর্থ যেহেতু পাঠকের হৃদয়ে হৃদয়ে পরিবর্তিত হয়, তাই তাকে অবশ্যই অসম্পূর্ণ এবং প্রথাগত নিয়মবর্জিত হতে হবে।

বিমূর্ত এবং মূর্তের এই খেলায় কবিতা সবসময়ই এক অস্থির তটভূমি। উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিক জাক দেরিদা যখন ‘বিনির্মাণ’ বা ‘ডিকনস্ট্রাকশন’ তত্ত্বের মাধ্যমে দেখালেন যে, ভাষার কোনো ধ্রুব অর্থ নেই, তখন কবিতার মুক্তি ত্বরান্বিত হল। আমি যখন এই তত্ত্বে জারিত হয়ে কোনও কবিতা দেখি, তখন মনে হয় প্রতিটি শব্দই আসলে একেকটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র। এখানে বাক্য কোনও বড় শাসক নয় যে সে শব্দগুলোকে তার আজ্ঞাবহ ভৃত্য করে রাখবে। বরং প্রতিটি শব্দ তার নিজস্ব শৈল্পিক উচ্চারণ নিয়ে বাক্যের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখায়। দেশি সাহিত্যের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্যের পথে’ গ্রন্থের সেই উদ্ধৃতিটি মনে পড়ে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে যা অনিবার্যভাবে প্রকাশের অতিরিক্ত, তাই সাহিত্য। এই ‘অতিরিক্ত’ অংশটুকুই হল কবিতার সেই অনিয়ম।

ইতিহাসের মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য থেকে আধুনিকতার হাহাকার পর্যন্ত শৈল্পিক উচ্চারণের বিবর্তন ঘটেছে শব্দের গভীরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। দান্তে থেকে শুরু করে এলিয়ট পর্যন্ত সবাই কোনও না কোনোভাবে প্রচলিত ভাষার কাঠামোকে আক্রমণ করেছেন। আমি যখন দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র সেই প্রগাঢ় স্তোত্রগুলো পড়ি, তখন দেখি সেখানেও ব্যাকরণ ছাপিয়ে এক ধরণের স্বর্গীয় সুর প্রধান হয়ে উঠেছে। আবার আধুনিক কবিরা যখন ‘ফ্রি ভার্স’ বা মুক্ত ছন্দের প্রবর্তন করলেন, তখন তারা আসলে বাক্যের সেই শৃঙ্খলটিকেই ভেঙে দিলেন যা শতাব্দী ধরে কবিতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। আমি বিশ্বাস করি, এই শৃঙ্খলমুক্তি ছাড়া কবিতা কখনোই তার মহাজাগতিক রূপ ধারণ করতে পারত না।

বোধের গহীনে যখন কোনও কবিতার জন্ম হয়, তখন তার কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র থাকে না। সেটি একটি জলপ্রপাতের মতো, যা কোনও নির্দিষ্ট খাতে বইতে বাধ্য নয়। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই হল কবিতার প্রাণভ্রমরা। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ যখন কবিতার সংজ্ঞায় ‘Spontaneous overflow of powerful feelings’ বলেছিলেন, তখন তিনি আসলে সেই আবেগের কথাই বলেছিলেন যা ব্যাকরণের বাঁধ মানতে চায় না। আমি মনে করি, আবেগ যখন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে আসে, তখন সে সুশৃঙ্খল সরল বাক্য তৈরি করতে পারে না; সে কেবল পারে অগ্নিকণা ছড়াতে থাকে। শব্দের এই অগ্নিকণাই হল তার শৈল্পিক উচ্চারণ, যা পাঠককে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে।

অস্বাভাবিকতা অনেক সময় শিল্পের শ্রেষ্ঠ পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। আমি যখন দেখি কোনও কবি একটি লাইনে মাত্র একটি শব্দ লিখে পরের লাইনে চলে যাচ্ছেন, তখন আমি সেখানে কোনও খামখেয়ালিপনা দেখি না, বরং দেখি এক বিশাল নৈঃশব্দ্যের প্রক্ষেপণ। বিদেশি সমালোচকরা একে ‘এস্থেটিক সাইলেন্স’ বলে অভিহিত করেছেন। এই নৈঃশব্দ্যকে ধারণ করার ক্ষমতা কোনও সাধারণ বাক্যের নেই। একটি প্রথাগত বাক্য সবসময় কিছু বলার জন্য মুখিয়ে থাকে, কিন্তু কবিতা অনেক সময় কিছু না বলেই সবটুকু বুঝিয়ে দিতে চায়। শব্দের শৈল্পিক উচ্চারণ তাই কেবল যা বলা হয় তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যা বলা হয় না তার মধ্যেও নিহিত।

গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে, কবিতা আসলে ভাষার এক ধরণের বিবর্তনবাদী রূপ। মানুষ যখন সাধারণ গদ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে কবিতার শরণাপন্ন হয় কারণ কবিতা তাকে মুক্তি দেয়। এই মুক্তি হল নিয়মের মুক্তি, বৃত্তের মুক্তি। রোল্যাঁ বার্থ যখন ‘লেখকের মৃত্যু’র কথা ঘোষণা করে পাঠকের স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, তখন তিনি আসলে কবিতার সেই অসম্পূর্ণতাকেই মহিমান্বিত করেছিলেন। আমি মনে করি, কবিতা যদি তার বাক্যকে নিয়ম মেনে শেষ করত, তবে পাঠকের কল্পনা সেখানে হোঁচট খেত। কিন্তু অসম্পূর্ণ বাক্য পাঠককে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার অধিকার দেয়, যা তাকেও একজন স্রষ্টায় রূপান্তরিত করে।

প্রথাগত ভাষার সাথে কবিতার এই যে যুদ্ধ, তা আদিম এবং চিরন্তন। কবি আসলে ভাষার এক পরম শত্রু এবং পরম বন্ধুও বটে। তিনি ভাষাকে ভাঙেন যাতে তাকে নতুন করে গড়া যায়। এই ভাঙাগড়ার খেলায় বাক্য যখন ছিন্নভিন্ন হয়, তখন তার রক্ত থেকে জন্ম নেয় নতুন নতুন চিত্রকল্প। আমি যখন জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই অদ্ভুত নির্জনতার কথা ভাবি, তখন দেখি তিনি কীভাবে বাক্যের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করে এক ধরণের মন্থরতা তৈরি করেছেন। এই মন্থরতাই হল তার শৈল্পিক উচ্চারণ। তিনি যদি সরল বাক্যে লিখতেন, তবে তার কবিতার সেই ধূসর পাণ্ডুলিপি আজ আমাদের মনে এমন গভীর রেখাপাত করতে পারত না।

অবশেষে আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই যে, কবিতা হল ভাষার সেই পরম মুহূর্ত যখন সে আর কেবল কথা থাকে না, বরং হয়ে ওঠে এক ঐশ্বরিক নাদ। এখানে সরল বাক্য বা ব্যাকরণের নিয়ম হল সেই খোলস যা ছেড়ে কবিতা বেরিয়ে আসে এক প্রজাপতির মতো। দেশি-বিদেশি তত্ত্বের আলোকে আমরা যে আলোচনা করলাম, তাতে স্পষ্ট যে শব্দের শৈল্পিক উচ্চারণই কবিতার শেষ কথা। বাক্য সেখানে কেবল একটি উপলক্ষ মাত্র। আমি বিশ্বাস করি, যতদিন মানুষের মনে আবেগ থাকবে এবং ভাষা থাকবে, ততদিন কবিতা এভাবেই নিয়মের শিকল ছিঁড়ে তার নিজস্ব ছন্দে উড়বে। এই অনিয়মের মধ্যেই কবিতার সার্থকতা, এই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই তার পূর্ণতা। কবিতা হল সেই অপার্থিব উচ্চারণ যা শেষ হয়েও শেষ হয় না, যা বাক্যের সীমানা পেরিয়ে এক অনন্তের দিকে পাঠককে চালিত করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top