
আমার এক দূর সম্পর্কের কাকা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি শুনেছি। রক্তের সম্পর্কে সে দূর হলেও আমাদের পরিবারেরই একজন। আমার ছোট কাকার পিঠাপিঠি বয়স, অতএব আমি যে সময়ের কথা বলছি, আমাদের বাড়িতেই বেশিরভাগ দিন নাওয়া-খাওয়া ছিল তার। সরস্বতী পুজো এলেই এখনও ছোটকা ওঁর কথা বলেন। সেবছর প্রথম মাধ্যমিক দেবে ওঁরা। সরস্বতী পুজোর আগের রাত থেকে পিকনিকের তোড়জোড় চলছিল বেলতলার মাঠে। এবাড়ি ওবাড়ি থেকে ছেলেপুলেরা চাঁদা তুলে ছোটখাটো একটা পুজো করছে। সকালে অঞ্জলি, তারপর সারাদিন আড্ডা গল্প হইচই। বিকেলের পর থেকে শুরু হবে পিকনিক। মেনুতে খিচুড়ি আর হাঁসের মাংস। এদিকে চাঁদা যা উঠেছে পুজোর জোগাড় করতে গিয়েই সব শেষ। খিচুড়ির ব্যবস্থা নয় চাল-ডালে হয়ে যাবে, কিন্তু হাঁসের মাংস? সে তো অনেক দাম!
আমাদের ঠিক সামনের গলিতে শিবনাথ দাদুর বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি ব্যানার্জি বাড়ির বেশ নামডাক। অথচ আমাদের বাড়ির কারোর সঙ্গে ওদের বাড়ির কেউ কথা বলে না। রাস্তায় দেখা হলে হাসিটুকু বেরোয় না মুখ দিয়ে। ছোটবেলায় একবার ওদের বাড়ির ছোটছেলে স্কুলভ্যানে আমাকে একটা ইরেজার দিয়েছিল, সে নিয়ে বাড়িতে কী অশান্তি! যাইহোক, যেটা বলছিলাম, শিবনাথ দাদুদের বাড়িতে নাকি গোটা ছয়েক হাঁস ছিল। ব্যাস, আর দেখে কে! পুজোর ঠিক আগের রাতে আমার দূর সম্পর্কের সেই কাকা আর নানকা কাকুর দুই ভাই মিলে একটা হাঁস নিয়ে চম্পট দেয়। সারা রাত, সারা দিন বাবলু কাকুদের গোয়ালঘরে আটকে রাখে হাঁসটাকে। পরেরদিন সন্ধের পর বলি হয় তার— আমার বাবা, ঠাকুরদা, মেজকা কেউ জানত না এই ঘটনা। এমনকী পাড়ার কেউ টের পায়নি।

দুদিন ধরে একটা হাঁস নিখোঁজ। দুদিন এপাড়া ও পাড়া খোঁজার পর শিবনাথ দাদু পরিষ্কার বুঝতে পারেন তাঁর হাঁস আসলে কোথায় গেছে। শুক্লা পঞ্চমী শেষ হবার ঠিক পরপর খোলা উঠোনে দাঁড়িয়ে শিবনাথ দাদু বলেছিলেন, “যারা যারা আমার হাঁস চুরি করেছে, মা সরস্বতীর অভিশাপ লাগবে তাদের। কেউ পাশ করবি না তোরা, কেউ না”। আর কী! যেমন কথা তেমন ফল। পিকনিকে অংশ নেওয়া সাতজনের একজনও মাধ্যমিক পাশ করেনি সেবছর। আর দূর সম্পর্কের সেই কাকা, যে কিনা পা টিপে টিপে কোলে করে হাঁসটা ধরে এনেছিল তিনবার মাধ্যমিকে বসার পর পড়াশোনাই ছেড়ে দিয়েছিল। আজ সম্পাদক মহাশয় আমাকে সরস্বতীকে নিয়ে লিখতে বলায় কেন জানি না ছোট কাকার মতোই আমারও বারবার মনে পড়ছে এই গল্পটা— সরস্বতী, জ্ঞান, বিদ্যা ও শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। আসলে আমাদের স্কুলের সঙ্গে পরিচয় ঘটার আগেই স্কুলে আসার মাধ্যমে হিসেবে পরিচয় ঘটে মা সরস্বতীর সঙ্গে। মনে করা হয়, হাতেখড়ির মধ্য দিয়ে শিশুর বিদ্যালয়ভীতি অনেকটা কাটানো সম্ভব।
আর্যরা সরস্বতীকে শুধুমাত্র বিদ্যার দেবী নয়, শস্যের দেবীরূপেও আরাধনা করতেন। ভাগবতে আলোচিত সাতটি নদীর মধ্যে সরস্বতীকে একটি নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৈদিকযুগে আর্যগণ সরস্বতী নদীর তীরে বসতি স্থাপন করে ওই নদীজলে পুষ্ট ভূমিতে চাষবাস করে শস্য উৎপাদন করতেন। তাই সরস্বতী বৈদিক সূক্তে অম্বিতমে, নদীতমে, দেবীতমে অর্থাৎ জননীশ্রেষ্ঠ, নদীশ্রেষ্ঠ ও দেবীশ্রেষ্ঠরূপে বন্দিত হয়েছেন। অনেক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকের মতে, প্রাচীন সরস্বতী নদী বর্তমান ভারতের হরিয়ানা, রাজস্থান এবং পাকিস্তানের কিছু অংশ দিয়ে প্রবাহিত হত। আধুনিক গবেষণায় অনেকে মনে করেন এখনকার ঘগ্গর-হাকড়া নদীখাতই প্রাচীন সরস্বতীর অবশেষ হতে পারে। ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন, নদীপথের পরিবর্তন এবং জলবায়ুগত কারণের ফলে নদীটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় বা ভূগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু সরস্বতী এইসব দৈবীকল্পনা ছাড়িয়ে কবে যে তিনি বাঙালির একান্ত ঘরোয়া বীণাধারিণী কলানিপুণা ও বিদ্যাসাম্রাজ্যের তরুণী অধিশ্বরী হয়ে উঠলেন তার তথ্য বেদে নেই। আমাদের লোকপুরাণ ও লোকবিশ্বাসই এই দেবীকে বাঙালির ঘরে আসন পেতে দিয়েছে। বাঙালির লৌকিক দেবদেবীরূপে যাঁরা সুপূজিত সেই হরপার্বতীর কন্যারূপেই অত্যন্ত ঘরোয়া সাজপোষাকেই শ্রীময়ী সরস্বতী।
শুনেছি কিশোর কিশোরীর বুকে প্রথম প্রেমের কুঁড়ি সরস্বতী পুজোর দিনই ধরতে শুরু করে। এমনকী অ্যাডোলেসেন্সের সঙ্গে সরস্বতীর একটা গভীর যোগ রয়েছে। পুরাণে ব্রহ্মা ও সরস্বতীকে নিয়ে বেশকিছু কিছু বিতর্কিত কাহিনিও আছে। কয়েকটি জায়গায় বলা হয়েছে, ব্রহ্মা নিজের সৃষ্ট সরস্বতীর রূপে মুগ্ধ ছিলেন। মূলত সৃষ্টিশক্তি, কামনা ও জ্ঞানের দ্বন্দ্বকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয় এইসব গল্পকথায়। আধুনিক গবেষকরা এগুলোকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে নয়, মিথ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যদিকে তান্ত্রিক দর্শনে জ্ঞান ও শক্তি অবিচ্ছেদ্য। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবজীবনের কামনা, প্রেম, যৌনতা এবং সৃজনশীলতা— সবই এক ধরনের শক্তির প্রকাশ। সরস্বতী সেই শক্তির জ্ঞানময় ও সৃজনশীল রূপের প্রতিনিধিত্ব করেন। বসন্তের আবহ, হলুদ শাড়ি-পাঞ্জাবি, স্কুল-কলেজের উৎসবমুখরতা এবং তরুণ-তরুণীদের আবেগ সরস্বতী পুজোকে “বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে”-তে পরিণত করেছে। এক্ষেত্রে যৌনতা সরাসরি নয়, বরং প্রেম, আকর্ষণ, সৌন্দর্যবোধ ও সম্পর্কের সূচনার সম্পর্ক। আসলে যৌনতা মানবজীবনের একটি স্বাভাবিক শক্তি। ভারতীয় চিন্তায় এই দুইকে (প্রেম ও যৌনতা) পরস্পরবিরোধী নয়, মানব অস্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা হিসেবে দেখানো হয়েছে বারবার।

বাংলায় সরস্বতী পুজোর সূত্রপাত সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের নানান মত রয়েছে। অনেকেই বলেন, বাংলায় সরস্বতী পুজো শুরু হয় ১৮০০ সালের দিকে। জানা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই পুজো শুরু করেছিলেন তাঁর রাজবাড়িতে। পুজোকে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। সেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের বইপত্র দেবীর সামনে রেখে পুজো করতো, আরাধনা করতো শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির। বিশ্বাস করত জ্ঞান অর্জন এবং শিক্ষায় উন্নতি লাভের একটি শুভ দিন এটি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সরস্বতী পুজো আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে পুজোর আচার-অনুষ্ঠান একটি সাধারণ ঐতিহ্য হয়ে যায়। এ সময়ে এটি শুধুমাত্র হিন্দু-ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত না হয়ে, জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের একটি সামাজিক অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়।
সরস্বতী মূলত বিদ্যা, জ্ঞান, সংগীত, শিল্প ও বাগ্মিতার দেবী। তাঁর মূর্তিতে শুভ্রতা, সংযম ও মানসিক পরিশীলনের প্রতীকী প্রকাশ দেখা যায়। আর যদি জিজ্ঞেস করেন, আমার কাছে সরস্বতী? না! তিনি আমার কাছে শুধু বিদ্যার দেবী নন। তিনি শব্দের ভিতরে জন্ম নেওয়া দৃঢ় স্বাধীনতা। তিনি সেই মুহূর্ত, যখন আমি শব্দের সঙ্গে শব্দ জুড়ি; তিনি আমার অস্বস্তি, আমার ব্যথা ও শক্তি— ক্যানভাসে এসে কতবার যে নিজেই নিজের অস্তিত্ব দাবি করেন তিনি! সরস্বতী আসলে নিজেই একটা সৃষ্টি। যে সৃষ্টি প্রশ্ন করতে জানে, প্রচলিত সংজ্ঞাকে অস্বীকার করতে জানে, নিজের ভাষা নিজেই তৈরি করতে জানে। তাঁর উপস্থিতির মধ্যে রয়েছে নারীর নিজস্ব সত্তা। তাঁকে কেবল ‘পবিত্র’ বলে দূরে সরিয়ে রাখার বদলে তাঁর সৌন্দর্য, শরীর, আকাঙ্ক্ষা এবং সৃষ্টিশীলতায় বাঁচতে চাই আমি। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার সঙ্গে স্বাধীনতার সম্পর্ক গভীর। যে শিক্ষা আমাকে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে শেখায়, তা কখনোই সম্পূর্ণ শিক্ষা হতে পারে না। যে শিক্ষা আমাকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়, নিজের চিন্তাকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে শেখায়— সরস্বতী আমার কাছে সে-ই। তিনি আমার কাছে শব্দের উৎসব। শিল্পের উৎসব। প্রসবের উৎসব। আমার কলম, আমার অসমাপ্ত ছবি, বইয়ের পাতা, কবিতা রং ও প্রতিবাদ। আসলে তাঁর যাত্রাও তো এক ধরনের রূপান্তরের ইতিহাস— জল থেকে শব্দে, শব্দ থেকে জ্ঞানে, জ্ঞান থেকে শিল্পে। প্রথম ‘অ’ লিখতে গিয়ে যে বিস্ময়, নিজের নাম প্রথমবার লিখে ফেলার যে আনন্দ, প্রথম কোনো ছড়ার একটি লাইন মুখস্থ হয়ে ওঠার যে সুখ, সেখানেও প্রেম আছে। সরস্বতী আমার সেই প্রথম প্রেমের সাক্ষী।
ভারতীয় ধর্মীয় কল্পনায় আমরা নারীদেবীকে বেশীরভাগ সময় মাতৃত্ব, পবিত্রতা ও ত্যাগের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে দেখতে অভ্যস্ত। সরস্বতীকেও আমরা প্রায়শই এমন এক নির্মল, অলৌকিক, কামনাহীন প্রতিমায় বন্দি করেছি, এবং মুছে দিয়েছি নারীসত্তার সমস্ত জটিলতা। কিন্তু একজন নারী কি কেবল পবিত্র হলেই স্বয়ংসম্পূর্ণ? একজন শিল্পী সেও কি আকাঙ্ক্ষাহীন? আমি বরং সরস্বতীকে একটু অন্যভাবে দেখতেই পছন্দ করি। তাঁর সৌন্দর্যকে আমি অস্বীকার করতে পারবো না কখনোই। অথচ তাঁর নারীত্বকে আমি ভয় পাই । মানুষের শরীরও তো এক ধরনের ভাষা। স্পর্শের নিজস্ব ভাষা আছে, আকাঙ্ক্ষার নিজস্ব ভাষা আছে, প্রেমেরও নিজস্ব ভাষা আছে। শিল্প সেই সমস্ত ভাষাকে ধারণ করে শুধু। ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে প্রেম, শরীর, কামনা ও যৌনতার অসংখ্য প্রকাশ রয়েছে। তাহলে বিদ্যার দেবীকে কেবল শরীরহীন করে রাখার এই প্রবণতা কোথা থেকে এলো? সম্ভবত সমাজ জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে চায় নারীর শরীরকে। আর এখানেই সরস্বতী আমার কাছে আরও সমকালীন হয়ে ওঠেন। বাঙালির সরস্বতী আমার কাছে শুধু ধর্মীয় দেবী নন। সরস্বতী আমার কাছে হলুদ শাড়ি, বাসন্তী রং, সাজগোজ, প্যান্ডেল, আড্ডা, কবিতা, গান—সব মিলিয়ে আমার অ্যাডোলেসেন্স ক্রাশ। সত্যি বলতে কী, আমার কাছে সরস্বতী আসলে ‘আমি’-র ভাষা, যে ভাষায় আমি বারবার প্রসব করি অক্ষর।***



