
“পুজো শুরু হয়ে গেলো। ঢাকের বাদ্যি শুরু হয়ে গেলো। টাকডুমাডুম টাকডুমাডুম টাকডুমাডুম ডুম। মা দুর্গা ঘরে আসবে তাই তো এতো ধুম।” পুজো এলেই মনের ব্যাকগ্রাউন্ডে দৈব বাণীর মতো এই মন্ত্র কে যেন অটো-প্লে করে দেয়! আমি দেখি ফেসবুকে এক ফচকে ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাজিক দেখাচ্ছেন কীভাবে হাতিকে রিপ্লেস করে ময়ূর বসিয়ে দিলেই বিশ্বকর্মা হয়ে যান কার্তিক। আমার মনে পড়ে যায় ‘ধুম টু’-র কথা। সেও এক ম্যাজিক রিয়ালিজম। আমি দেখি জেন জির শহর কলকাতা, হাইহিল ফ্লাইওভার আর ঝাঁ চকচকে শপিংমল থেকে ঐশ্বর্যকে বগলদাবা করে নাচতে নাচতে বেরিয়ে আসছেন রোশনলাল আই মিন ঋত্বিক রোশন। গ্রিক গড আউটলুক। ইয়া বাইসেপ, এইটথ্ প্যাক অ্যাবস। কার্তিকের চরিত্রে এর চেয়ে উত্তম কাস্টিং আর কে হতে পারে! ভাবতে ভাবতেই দেখি শহরের সমস্ত হোর্ডিংজুড়ে কার্তিক আর কার্তিক। কখনও ট্রিমার হাতে মিলিন্দ সোমান কখনও ডিউরেক্সে রণবীর সিং।
পুজো এলেই বাঙালি ছেলেরা কার্তিক হতে চায়। শুরু হয় জিমে যাওয়ার ধুম। একটু ডাম্বেল টাম্বেল না ভাজলে কী আর বাংলা কার্তিকের মান সম্মান থাকে! কার্তিক মানেই হয় ব্যকব্রাশ করা চুল, নয় জেল দিয়ে হালকা করে স্পাইক। জন্ম সত্তর-আশিতে হলে জাঞ্জিরের অমিতাভ, বেলবটম প্যান্ট, কানঢাকা চুল। পুরো ঝারপিটের ছবি। অ্যাংরি ইয়ংম্যান বস। সে কী সোয়্যাগ! নব্বইয়ে আমাদের মিঠুনদা—“মারবো এখানে লাশ পড়বে শ্মশানে”। গুরু অ্যাকশন হিরো বলে কথা। আরে দাদা শুধু কী ইজরাইল ইরাকে বোম মারবে, আমাদেরও দেব সেনাপতি ওরফে কাজের মানুষ কাছের মানুষ পাগলুদা আছে। রূপে কার্তিক গুণে ফুলটু বৃহস্পতি। পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে এক্কেবারে ফাতা ফাতা করে দিতে পারে। বাংলায় যাকে বলে চ্যালেঞ্জ নিবি না শাল্লা। এসব আমার কথা নয় সেই কবে মিরাক্কেলে কাত্তিকদা বলেছেন—”পাগলা মা হারালে মা পাওয়া যায়, বউ হারালে বউ পাওয়া যায় না রে”।

“পৃথিবী হারিয়ে গেলো মরু সাহারায়”— আমি দেখি মাতাল ঠাকুর বিশ্বকর্মা, পুজোর ঝাকানাকা সন্ধে, সাদা জামা সাদা প্যান্ট সাদা জুতো সাদা টুপি পরে আমাদের অর্কেস্ট্রা কিং কাত্তিকদা স্টেজ কাঁপাচ্ছেন। কাত্তিকদা আমাদের নৈহাটি-বড়া রুটে ফুলটাইম অটো ইউনিয়ান লিডার। লড়াকু নেতা সঙ্গে পার্টটাইম গানবাজনা। ছোটবেলায় দুধে-আলতা গায়ের রং হওয়ায় মা-বাবা শখ করে নাম রেখেছিলেন কার্তিক। কিন্তু পড়াশুনায় লবডঙ্কা। ম্যাট্রিকে ফেলের হ্যাট্রিক মেরে কার্তিকদা হয়ে গেলেন অটো-কাত্তিক। ঈশ্বরের নামে নাম, সে কী আর মাকাল ফল হয়! দাদা আমাদের সংস্কৃতিবান। গান-ফান করেন। একটা আলাদা ইমেজ আছে। কী যেন বলে স্টাইল, হ্যাঁ স্টাইল আছে। ইউনিয়ান তো গুরুর পকেটে। ভূতের ভবিষ্যতের কার্তিকদাকে ভুলে গেলেন! ফ্রম ফুটো মস্তান টু হাতকাটা কার্তিক। আমাদের কাত্তিকদা হলো তার রিয়াল লাইফ এক্সাম্পেল।
এদিকে কার্তিক ঠাকুরকে নিয়ে বাঙালির আলাদাই আবেগ। একদিকে তিনি হলেন গিয়ে দেব সেনাপতি। যুদ্ধ ও উর্বরতার দেবতা। পুরাণ অনুসারে ভয়ঙ্কর তারকাসুরকে বধ করার জন্য তাঁর জন্ম। আবার অন্যদিকে কার্তিক মানে একটা এভার গ্রিন ব্যাপার। কার্তিক ঠাকুরের মধ্যে রয়েছে পুরুষের সেই কাঙ্খিত আল্টিমেট সৌন্দর্য। যদিও কৃত্তিবাসী রামায়ণে কার্তিক বাঙালির ঘরের ছেলে। অত্যন্ত স্নেহময়, লৌকিক ও ভক্তিপূর্ণ পৌরাণিক চরিত্র। নিম্নবিত্ত বাঙালি সন্তান আধপেটা খেয়েও চিরকাল কার্তিক হতে চেয়েছে। তাতে দিনের মধ্যে বারবার যেমন ঠাকুরের নাম নেওয়া যায়, তেমনি সেই নামের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে থাকে সুপুরুষ হওয়ার বাসনা। আর তাই কার্তিকের সঙ্গে মিঠুন চক্রবর্তী কোথাও গিয়ে খাপে খাপ হয়ে যান। বৃষ্টি বিকেলে রিকশা চালাতে চালাতে জীবন গেয়ে ওঠে “মুঝকো পিনা হ্যায় পিনে দো, মুঝকো জিনা হ্যায় জিনে দো”।
ঠাকুর কার্তিকের বাহন ময়ূর, কথিত আছে ময়ূরের পিঠে চেপে তিনি পৃথিবী পরিক্রমা করেছিলেন। এই ময়ূর আবার শৌর্য ও সতর্কতার প্রতীক। এক প্রচলিত পুরাণকথা অনুযায়ী শিবের তেজ থেকে জন্ম নেয় এক অসাধারণ শক্তিশালী শিশু। সেই শিশুকে ছয়জন কৃত্তিকা লালন-পালন করেন। কৃত্তিকা অর্থাৎ ছয়জন মায়ের প্রত্যেকেই শিশুটিকে স্তন্যপান করাতে চাইলে শিশুটি ছয়টি মুখ ধারণ করে যাতে একই সঙ্গে ছয় মায়ের দুধ সে পান করতে পারে। সেই থেকেই তাঁর নাম হয় ষড়ানন, ষণ্মুখ বা ষড়মুখ অর্থাৎ ছয় মুখের অধিকারী। এই ছয় মুখকে শুধু ছয়জন মায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হয় না। পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ছয়টি মুখকে মানুষের ছয়টি ইন্দ্রিয়, ছয় দিক অথবা জ্ঞান ও শক্তির বিভিন্ন প্রকাশের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কার্তিক নামটিও এসেছে কৃত্তিকা থেকে। ফলে কার্তিকের ছয় মাথার মিথের কেন্দ্রে আসলে রয়েছে ছয় মাতৃত্ব, এক সন্তান এবং এক অসীম শক্তির জন্ম।
হুগলির বাঁশবেড়িয়া যেন বাংলার মানচিত্রে এক আলাদা কার্তিক-নগরী। স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী সপ্তগ্রামের বণিক সম্প্রদায়ের হাত ধরে আনুমানিক ১৬০০ সাল নাগাদ এই পুজোর সূত্রপাত। এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য— কার্তিক এখানে এক রূপে নন, বরং বহু রূপে হাজির হন। রাজা কার্তিক, বাবু কার্তিক, জামাই কার্তিক, জ্যাংরা কার্তিক, ধুমো কার্তিক, অর্জুন কার্তিক, ধেড়ে কার্তিক, ষড়ানন বা ছয় মাথার কার্তিক। প্রতিটি প্রতিমার নিজস্ব লোককথা, সাজসজ্জা এবং পুজোর ঐতিহ্য রয়েছে। আবার কাটোয়ার কার্তিক লড়াই বাংলা লোকসংস্কৃতির এক আশ্চর্য উৎসব, যার মধ্যে পুজোর সঙ্গে মিশে আছে প্রতিযোগিতা, বাবুসমাজের ঐতিহ্য, শোভাযাত্রা এবং পুরনো জনজীবনের স্মৃতি। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় কয়েকশো বছর আগে ভাগীরথীর তীরবর্তী কাটোয়ার চুনারি পাড়ায় কার্তিক পুজোর সূত্রপাত হয়। সাত ভাই কার্তিক, ন্যাংটা কার্তিক, বাঁকা কার্তিক প্রভৃতি এখানকার জনপ্রিয় কার্তিক।পুত্রসন্তানের কামনায় এখানকার যৌনকর্মীরা কার্তিকের আরাধনা করতেন এবং তাঁদের পুজোয় পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বণিক ও বাবুরা। এই লড়াইয়ের আর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় স্থানীয় ইতিহাস চর্চায়। গবেষক স্বপনকুমার ঠাকুরের মতে, জমিদারদের লেঠেলদের মধ্যে বিসর্জনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং লাঠিখেলার ঐতিহ্য থেকেই ‘কার্তিক লড়াই’ শব্দবন্ধের প্রচলন। তবে এই ফাঁকে একটা মজার ইনফো দিয়ে রাখি সার্চ-ইঞ্জিনে কার্তিক লিখে সার্চ করলে এই মুহূর্তে ট্রেন্ডিং বাংলার কার্তিক মহারাজ।

বাঙালি লোকবিশ্বাসে কার্তিক ঠাকুরকে ‘চিরকুমার’ বা অবিবাহিত মনে করা হলেও আসলে কার্তিকের দুই স্ত্রী দেবসেনা ও বল্লী। মূলত দক্ষিণ ভারতীয় স্কন্দ-পুরাণ থেকে জানা যায় দেবসেনা দেবরাজ ইন্দ্রের পালিতা কন্যা। দেবলোকের শৃঙ্খলা, কর্তব্য ও ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক। অন্যদিকে বল্লী ছিলেন পাহাড়ি শিকারি সম্প্রদায় নাম্বিরাজের কন্যা। সে যাই হোক কার্তিক ঠাকুরকে নিয়ে সবচেয়ে মজার বিষয়টি হলো পুজোর আগের রাতে নবদম্পতি বা সদ্য বিবাহিতদের বাড়ির সামনে কার্তিক ঠাকুর রেখে আসা বা ‘কার্তিক ফেলা’। মূলত সন্তান কামনায় কার্তিকের পুজো বাংলার একটি দীর্ঘদিনের পরিচিত লোকায়ত আচার। তবে ফচকে ছেলেপুলে খচরামি করে এর তার বাড়িতে কার্তিক ফেলা এক সময়ের কমন গল্প। অনেকটা সেই বসন্ত বিলাপের আঁঠার বালতি হাতে পোস্টার মারার মতো নির্ভেজাল কমেডি।
এক ঢিলে দুই পাখি আমরা প্রায় সবাই শুনেছি, কিন্তু এক গুলিতে ছয়জন ঘায়েল? দক্ষিণ ভারতীয় ছবি “কুইক গান মুরুগান” সিনেমার এ বিরল দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারিনি। দক্ষিণে কার্তিককে মুরুগান রূপে পুজো করা হয়। তামিলনাড়ু, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে তামিল জনগোষ্ঠীর কাছে মুরুগান অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি শিব ও পার্বতীর কনিষ্ঠ পুত্র এবং গণেশের ছোট ভাই। মুরুগানকে যুদ্ধের দেবতা এবং তামিলনাড়ুর রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তামিলনাড়ুর সালেম জেলায় অবস্থিত শ্রীমুথুমালাই মুরুগান মন্দিরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বা উচুঁ মুরুগান মূর্তি রয়েছে। যার উচ্চতা ১৪৬ ফুট। এছাড়া ১৪০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্তিক মূর্তি রয়েছে মালয়েশিয়ার বাটু কেভস-এ। এটি প্রাচীন চুনাপাথরের গুহা কেটে তৈরি বিশাল মন্দির কমপ্লেক্স। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে থাকা বিশালাকার সোনালি রঙের কার্তিক মূর্তিটি পর্যটক ও ভক্তদের প্রধান আকর্ষণ। আর উচ্চতার দিক থেকে দেখলে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত কার্তিক মন্দিরটি হলো উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত কার্তিক স্বামী মন্দির। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১০,০০০ ফুটেরও বেশি।
লেখাটা শেষ করবো ফারহান আখতার অভিনীত “কার্তিক কলিং কার্তিক” সিনেমার সেই অদ্ভুত ফোনকল দিয়ে যেখানে হঠাৎ একদিন কার্তিককে ফোন করে কার্তিক। আর তারপর কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের জীবন বদলে যায় তাই নিয়েই এগিয়েছে গল্প। আমি বলছি সেই কার্তিকের কথা, যে রয়েছে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে, আমাদের অল্টার ইগো হয়ে। যাকে ছোঁয়া যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। আর অনুভব করতে শুরু করলেই বদলে যায় জীবন!***



