
“শাড়িটা কোথা থেকে নিয়েছিস রে?”
“আমার একটা চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড আছে, ওর বুটিক থেকে।”
“আর কোনো ছবি তুলিসনি ডেটে?”
“ধুস এই একটা যে তুলে দিয়েছে, অনেক। ফার্স্ট ডেটে ওকে ফটোগ্রাফার বানিয়ে দেবো? পাগল নাকি।”
“এই আমাকে একটা এনে দিবি রে? সঙ্গে এই রকম একটা ব্লাউজ, ব্যাকটা আরও একটু ডিপ।”
“আচ্ছা বাবা এনে দেবো। এখন চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“দাঁড়া কফিটা শেষ করি।”
বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ছে ক্যাফেটেরিয়ায়। মহুল সাদা আঁচলটা কাঁধে তুলে উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। নাভিটা খানিক বের করে বলল, “এটা নতুন নিয়েছি”। বিপাশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পিয়ার্সিং করিয়েছিস? কবে? ব্যথা লাগেনি? ও মাই গড!”
“আরে, অনি এসব খুব পছন্দ করে।”
“অনিমেষ? পিয়ার্সিং? কী বলছিস! সাদামাটা ছেলেটা… দেখলে মনে হয় কেমন বিধবা গোছের।”
“অ্যাই ধ্যাৎ… বাজে কথা বলিস না।”
“বাজে কই বললাম, তোর যে কী দেখে ওকে এত পছন্দ! ওর তো নাক টিপলে দুধ বেরোয় এখনও। সাদা পাঞ্জাবি, ফতুয়া পরে ঝোলায় কবিতা নিয়ে ঘোরে।”
“ওই কবিতাই তো আমাকে শেষ করে দিল রে! রাতের পর রাত গীতগোবিন্দ শুনিয়েছে আমাকে।”
“হোয়াট? গীতগোবিন্দ! মানে? এই ছাড় এসব, বল তো বিয়েটা করছিস কবে?”
মহুল মুচকি হেসে বিপাশাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “ন্যাড়া ক’বার বেলতলা যায় বিপাশা? চল উঠি, এবার দেরি হচ্ছে না তোর?”
ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে দু’জন একটা ক্যাব বুক করল, তারপর সোজা ধর্মতলা। ওখানে আজ জমায়েত আছে। কানা সাপের মতো গা গলিয়ে মিছিলের একেবারে প্রথম সারিতে গিয়ে পৌঁছাল মহুল। বিপাশা মধ্যিখানে। এপাশ-ওপাশ ঘাড় উঁচু করেও মহুলকে আর দেখতে পাচ্ছে না। কখন যে হাত ছেড়ে বেরিয়ে গেছে মেয়েটা! শাড়ির কুচিটা একটু ঠিক করে কাঁধের ঝোলা থেকে চশমা বের করে পরে নিল মহুল। স্লিভলেস ব্লাউজের ওপর ধবধবে আঁচলটা ওর থেকেও বেশি ক্যাজুয়াল। তারপর প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিতে থাকল, “বিচার চাই, বিচার কই।”
দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে গোটা শহর। বিচার বিচার বিচার চেয়ে সাধারণ মানুষের সেই হাহাকার উপচে পড়ছে ঘুমন্ত আকাশর বুক চিরে। মোমবাতি, প্ল্যাকার্ড, পথনাটক, গান, কবিতা… কী উন্মাদনা! একটার পর একটা ছবি উঠছে, ভিডিও হচ্ছে, রিলস হচ্ছে। কতগুলো অনশনকারি শুকনো মুখ নিয়ে টলতে টলতে মিছিলে হাঁটছে।
মহুলও হাঁটছে। চোখ থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে গাঢ় নীল আইলাইনার। ঠোঁটে নুড কফি শেড।
বিশ্ববাংলা গেট পেরিয়ে যাচ্ছে মধ্যরাতের ব়্যাপিডো। মহুলের হলডলে খোপাটা খুলে গেছে বাইকের দুলুনিতে। হাওয়ার স্পর্শে চুলগুলো ছন্নছাড়া।
“আপনার বাড়ি কি এখানেই?”
“নেহি ম্যাডাম, হাওড়া।”
“ওউ।”
“ম্যাডাম এক বাত পুছু?”
“হাঁ পুছো না”
“আপকো ডর নেহি লাগতি? ইতনে রাত মে, কোয়ি কাম থা কেয়া?”
“হা হা… আমরা আজ রাত দখল করতে গিয়েছিলাম।”
“কলকাত্তা সেফ নেহি হ্যায় মেডামজি।”
“ওটাই তো তৈরি করতে হবে আমাদের, তাই না? হামারা হি তো রেসপন্সিবলিটি হ্যায়।”
“হাঁ, ও তো হ্যায়।”
বাইক থেকে নেমে কম্পপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকল মহুল। গার্ডকে হাত দেখিয়ে কট কট করে জুতোর শব্দ করতে করতে লিফ্ট নিল। দশ তলার ওপর ফোর বিএইচকে, খোলামেলা, কোজি আর মহুলের নিজস্ব সাজানো গোছানো আস্তানা। বছর দুয়েক হল অ্যালমনিতে পেয়েছে। এক্স-হাজবেন্ড মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট। ছ’মাসে একবার এখানে পা রাখেন। মাসে মাসে মেয়ের জন্য খরচপাতি পাঠালেও ওই… একদিন একবেলার জন্য আসেন। বছর তিনেকের ছোট্ট মেয়েটাকে দেখে যান। ওর পছন্দের চকলেট সফ্ট টয়েজ আনেন। আর সারাটা দিন মেয়ের সঙ্গে কাটান। ফ্ল্যাটে মহুল আর টুসির সঙ্গে সব সময়ের পরিচারিকা মায়াদি আছেন।
মহুল বেল বাজাতেই টলমলে পায়ে ছুটে এলো ওর ছোট্টো টুসি। মহুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মায়াদি, টুসিকে ঘুম পাড়াওনি?”
“অ মা, ও শুলি পরে তো ঘুম পারামু। শুতিই চাইলনি। শুধু ম্যা ম্যা করতাসে।”
“মাম্মা, যাও, শুয়ে পড়। আম টায়ার্ড!”
সঙ্গে সঙ্গে ফোন ভাইব্রেট করে উঠল। মহুল কল রিসিভ করে ওর রুমে গেল। টুসি হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে ওই ঘরের দিকে। দুম করে দরজা বন্ধ করে দিল মহুল।
“তোকে তো বলছি কাল চলে আয়… না না এখন ঢুকলাম। হুম মাম্মা ঘুমোতে গেল। তাহলে এখন আয়। ইয়ার্কি মারছি না… কেন মায়াদি যেন তোকে চেনে না। ন্যাকামো হচ্ছে! আচ্ছা কাল আয়। একদম আর্লি না, দশটা। বাবু, ঘুমাবো তো… ওকে, ইউ ফার্স্ট কিস মি, ম্যুয়া…!”
মহুল ফোনটা বিছানায় ফেলে দরজাটা খুলে জোরে হাঁক দিল একবার, “মায়াদি… এদিকে শোনো। বলছি কাল অনিমেষ আসবে। ও তো ব্রেড খায় না… একটু লুচিটুচি করে রেখো।”
দরজা বন্ধ করে ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিল মহুল। একটা একটা করে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়ে শাড়ির আঁচল নামিয়ে নিল। এই আলো আঁধারে নিজের আবছায়া অর্ধনগ্ন শরীর দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। আলমারি খুলে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর একটা কাপড়ের ব্যাগ বের করল। এসিটা অন করে ইউটিউবে হালকা আঁচে বেগম আখতার চালিয়ে আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বুকের এক পাশ কালো চুল দিয়ে ঢেকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখা টুলটায় বসল। তারপর ডুবে গেল নিজের মধ্যে, খেয়ালে বেখায়ালে… কিছুক্ষণ পর পা টিপে টিপে খাটের দিকে এগিয়ে গেল। কাপড়ের ব্যাগ থেকে প্রথমে একটা দড়ি বের করলো। তারপর একে একে হ্যান্ডকাফস, কলার, হুইপস, বল গ্যাগস, প্যাডেলস, নিপল ক্ল্যাম্পস, আইমাস্ক…।
একটা অকপট হাসি। ম্লান হয়ে এল তানপুরা।
“ফাক মি, ফাক মি… বি আ ম্যান, বুলশিট! ফাক লাইক আ রেপিস্ট। আহঃ আহঃ।”
এরপর আর কোথাও কোনও শব্দ নেই… গায়ে চাদর জড়িয়ে বেডরুম লাগোয়া ব্যালকনির মেঝেতে বসে পড়ল মহুল। মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখল লাল হয়ে গেছে আকাশ, একটাও তারা নেই। সিগারেট ধরাল। মোবাইলটা কাছে এনে ফেসবুক ওপেন করে বাঁ হাতে টাইপ করল: আগামীকাল রাত নটায় বাংলা আকাদেমির সামনে জমায়েত।
ব্যাকস্পেস দিয়ে ফিরে এল গ্যালারিতে। সন্ধেবেলার বেশকিছু ছবি থেকে দু’টো ছবি বেছে প্রথমে এডিট করল। তারপর আপলোড করল ছবিসহ স্টেটাস—আগামীকাল রাত ন’টায় বাংলা আকাদেমির সামনে আমরা মেয়েটির বিচার চাইতে যাচ্ছি। আসুন, সামিল হন রাত দখলের লড়াইয়ে।



