ঠাকুমার ‘বিসর্জন’ ও সেই বেড়ালটা —-শুভদীপ মল্লিক

উত্তর কলকাতার আর পাঁচটা বাড়ির মতো আমাদের বাড়িটাও প্রাচীন। নোনা ধরা ইট, এদিকে ওদিকে খসে পড়েছে দেওয়াল, মাটিতে দিকে দিকে শ্যাওলার আস্তরণ। কিন্তু বহুদিন পর ছাদে উঠতেই এসবের সোঁদা গন্ধই আমাকে মাতাল করে দিল। পাঁচিলের ধারে এসে দিগন্ত বিস্তৃ আকাশে চোখ রাখতেই এক অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে উঠল। এত নীল আকাশ কি আগে কখনও দেখেছি? মনে পড়ছে না। চোখ নামাতেই সামনে ভেসে উঠল এলোমেলাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো, দু’একটা গাড়ি নিচের রাস্তাটা দিয়ে চলে যাচ্ছে। আসল সামনেই পুজো। এবং আমার সেই বেড়ালটাকে মনে পড়ছে!

কয়েক মিনিটের জন্য কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎই এক বেপরোয়া হাওয়ার ঝাপটায় সম্বিত ফিরল। দেখি চোখের কোণে অজান্তেই জমা হয়েছে জল। এরকমই একটা দুর্গাপুজোতেই তো… মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল ছ’বছর আগের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি। উমার সঙ্গেই তো ‘বিসর্জন’ হয়েছিল আমার ঠাকুমারও! আর সাদা বেড়ালটা! ও কোথায় এখন? কী করছে?

দু’বছর শয্যাশায়ী ছিল ঠাকুমা। বাড়ির সকলেই বুঝতে পারছিলাম, সময় ফুরিয়ে এসেছে। সময়টা ২০১৯ সালের দুর্গাপুজো। ততদিনে ঠাকুমা বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়েছে! শুধু ‌হৃৎপিণ্ডটাই চলছে। নেই কোনও অনুভূতি বা আবেগ।

সেদিন ছিল দশমী। সকাল থেকেই বাড়িটা কেমন বিষণ্ণ লাগছিল। যেন অজানা পোড়ো এক রাজপ্রসাদে বন্দিনী কোনও প্রেতাত্মা গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছে! কিছুতেই নিজেকে শান্ত রাখতে পারছিলাম না। বার বার ছুটে যাচ্ছিলাম ঠাকুমার ঘরে। ঠাকুমার আদরের একটা সাদা বেড়াল ছিল। আমি ওকে ছোট থেকেই দেখছি। সেদিন জানি না কেন বেড়ালটা ঠাকুমার ঘরের দরজার চৌকাঠ ছেড়ে একটুও নড়ছিল না। ঠাকুমাকে পাহারা দিচ্ছিল? শুনেছি পশুপাখিরা খুব সংবেদনশীল। আসন্ন বিপদের কথা নাকি আগে থেকেই টের পায়। হয়তো বেড়ালটা সেদিন সেটাই জানান দিচ্ছিল।

সেদিন প্রথম দুপুরে ঠাকুমা খাবার খেতে পারল না। দেখলাম মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল খাবার। আর শুনতে পেয়েছিলাম ওর বুকের ভিতর থেকে অদ্ভুত এক গর্জন! আমার বয়স তখন অনেকটাই কম। ওই দৃশ্য দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি, ছুটে পালিয়ে গিয়েছিলাম ঘর থেকে। ছাদে গিয়ে একান্তে কেঁদেছিলাম। ঠাকুমার শেষ কিছু মুহূর্তের স্মৃতিভেজা সেই অশ্রুজল আজও হয়তো খুঁজলে পাওয়া যাবে পাঁচিলের কোনও এক ইটের কোণায়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামল। বাইরে ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে বিসর্জনের তোড়জোড়। বাজছে গান, কাঁসর-ঘণ্টা, ঢাকঢোল। কিন্তু এসবের মাঝে সেদিন প্রথম আমাদের বাড়িটাকে অচেনা লেগেছিল আমার! আর কানে এসেছিল সুপ্রিয়াদি’র সেই কথাটা, “আজ রাতটা মনে হয় কাটবে না!” সুপ্রিয়াদি মানে আমার ঠাকুমাকে যিনি দেখাশোনা করতেন। ওঁর ওই একটা কথা আমাকে ভিতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। দশমীর সেই সন্ধ্য়াটাকে আমার মনে হয়েছিল সাক্ষাৎ যমদূতের আগমন বার্তা। নিজেকে সামলে কোনওক্রমে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগে একবার উঁকি মেরেছিলাম ঠাকুমার ঘরে। শুনেছিলাম সেই ভয়াবহ মৃত্যু-গর্জনের শব্দ! দেখেছিলাম ঠাকুমার আদরের বেড়ালটাকেও। একই রকমভাবে তখনও সেখানেই বসে। আজও আক্ষেপ হয়, সেদিন ঠাকুমার কাছে যেতে পারিনি। কিন্তু কী করব আমি? মানুষের প্রবল কষ্টের সামনে আমি পাথর হয়ে যাই! কোনও এক অদৃশ্য জাল আমাকে পেঁচিয়ে ধরে!

রাত তখন আটটা বাজে। ঠাকুমার ঘরে হঠাৎ চেঁচামেচি। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম। ঘরে প্রবেশ করতেই ফের পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ঠাকুমা। অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া তাঁর অনেকদিন আগেই চলে গিয়েছিল। বুঝতে পারলাম, এবার যাবার পালা টিমটিম করে জ্বলতে থাকা প্রাণটার। আর বদ্ধ থাকবে না সে। ততক্ষণে সেই শিউরে ওঠা গর্জন আরও বেড়ে গিয়েছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যন্ত্রণার মাত্রাও। আর সেসবের মাঝেই আমার কানে আসছে বাইরে বিসর্জনের কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ। উল্লাসিত হয়ে লোকে বলছে, ‘বলো দুর্গা মাইকি’, ‘আসছে বছর আবার হবে’। আর সেই বেড়ালটা?

চৌকাঠের পাশে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ঘরের দিকে। জীবনে সেই প্রথম চোখের সামনে থেকে মৃত্যুকে দেখেছিলাম আমি। বুঝতে পেরেছিলাম পৃথিবীর এই কঠিন সত্য থেকে পালাবার পথ নেই মানুষের। রাজা হোক কিংবা ফকির… মৃত্যুর করাল গ্রাসে পড়তে হবে সকলকেই।

সেদিন তিন থেকে চার মিনিট ঠাকুমার ঘরে চলেছিল মৃত্যুর ভয়ংকর সেই লীলাখেলা। তারপর… সব শান্ত! নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল ঠাকুমার প্রাণহীন শরীরটা। ততক্ষণে শুরু হয়েছে হাহাকার। কিন্তু জানি না কেন, আমি সেই মুহূর্তে মরা ঠাকুমার মতোই আবেগহীন হয়ে পড়েছিলাম! ঘরের বাইরে পা রাখতেই চোখের কোণা দিয়ে জল গড়িয়ে এল। বিষণ্ন সন্ধ্যায় তখনও দেখেছিলাম বেড়ালটাকে একইরকম ভাবে বসে থাকতে। তবে সেটাই ছিল শেষ দেখা।

সেদিনের পর থেকে বেড়ালটার কোথাও কোনোখানে খুঁজে পাইনি। ও কোথায় এখন? বেঁচে আছে? নাকি ঠাকুমার সঙ্গেই মিশে গিয়েছে আজানা দুনিয়ায়?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top