হক স্যরের দেওয়া শারদ সংখ্যা, পাতাজুড়ে মায়ের মুখ —শাশ্বত কর

আকাশে পুজো পুজো মেঘ। শাদা মেঘের পাশে ঘুড়ি। ঘুড়ি কেটে গেলে মেঘ হয়ে যায় মনে হত আমার। সুকুমারদা সে ভাবনা ভেঙে দিয়েছিল। দাদাভাইয়ের অত উঁচুতে বিন্দুর মতো হয়ে যাওয়া লাট্টু ঘুড়িটা যখন তিনবার চেত্তা খেয়ে উপরে গেল, শেষ অবধি দেখেছিলাম ভাসতে ভাসতে সেটা মেঘে মিশে গেল! কিন্তু প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে সুকুমারদা সেটা ধরে এনে দাদাভাইয়ের কাছেই বিক্রি করে দিল!

ঘুড়ি ওড়ে বিশ্বকর্মা পুজোয়। বিশ্বকর্মা পুজো এল মানেই পুজো চলে এল। আমরা তো তাই বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস কি আর এমনি আসে? চারপাশের পাখি ফুল গাছপালা মায় মানুষের মেজাজে অবধি পুজো পুজো রং। পুকুর পাড়ে- বুড়ির জলার ধারে কাশফুলের দোল। ঠাকুমা বলতেন… কাশকন্যেদের আড্ডা শরতের হাওয়ার সাথে। বাড়িতে রোববার হলেই আত্মীয়স্বজন। হাতের ব্যাগে ছোটদের পার্বণি। পাড়ার মুদিখানায় রিলক্যাপ, রোলক্যাপ উঠেছে। পাড়ায় মণ্ডপের কাঠামো হয়েছে। বাঁশে দোল খাচ্ছে ছেলেমেয়েরা। বড়দের মেজাজও ফুরফুরে। পড়তে না বসলে বলতে ভুলে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই ঘরেঘরে সর্দিজ্বর। চলে যাবে বলে মাঝেমধ্যেই বর্ষা রাতভর কেঁদে ভাসাচ্ছে। ইশকুলেও ছুটির মেজাজ যেন। রাগী সব স্যাররাও খেলাধুলোয় যোগ দিচ্ছেন। সকালে রেডিও শোনেন বাবা। দাঁত মাজতে মাজতে বাগানে ঘুরি আর শুনি। শরতের চিঠি পড়ছেন প্রাত্যহিকী। সাজি ভরে স্থলপদ্ম তুলছে কাকিমা। এত কিছু দেখেও মন নাচবে না? মনে হবে না দিন এগিয়ে আসছে?

শরৎ এল তো পুজো এল। কখনও মা আসেন একটু দেরিতে। বাতাসে তখন হিমের ছোঁয়া । ঘাসে হিমের মুক্তো। মুক্তোয় শিশু সূর্য হাসছেন। হাঁটতে গেলে পায়ের পাতায় মরা ঘাস আর তুষের জলের আরাম।

মহালয়ার শেষ রাত। বাড়িশুদ্ধ সবাই উঠে পড়েছে। বাড়িশুদ্ধ না পাড়াশুদ্ধ সবাই উঠে পড়েছে। একটু পরেই রেডিওয় মহিষাসুরমর্দিনী শুরু হবে। বাপির বাবা বক্সে রেডিওর তার জুড়বেন। আলস্য চোখ ছাড়ছে না। দিদা আলতো করে ডাকছেন। বলছেন, ‘ওঠো বাবু, মহালয়া শুনবা না? মা দুগগা আর অসুরের যুদ্ধ হবে- শুনবা না?’

শেষ রাতের আয়েসের দামই আলাদা! মাথা নেড়ে উঁ উঁ করছি। দিদা বলছেন, ‘উঠো ভাই! আলো ফুটবে, বাগান থেকে ফুল কুড়াবা না?’
তড়াক করে উঠে পড়লাম। এই সকালে যে বাড়ির গাছতলাতেই যাব, সেখানেই ফুল পাব। ফুল তোলার থেকে ফুল কুড়িয়ে মজা! হিম ঝরা মাটি। থরে থরে ফুল সাজিয়ে রেখেছে গাছ। কুড়োতে যাও গন্ধ বয়ে আদর দেবে। হাওয়ার ছুঁতোয় টপটপ করে ঝরে পড়বে মাথায়। পুষ্পবৃষ্টি। কাঁঠালচাঁপা, বকুল আর শিউলি। ভিজে শিউলি শিশুর মত নরম। শিশুর মতোই স্নিগ্ধ। স্বর্গের সুগন্ধ তার। মা আসেন বলেই বোধহয় শিউলি আসে। দু’হাত ভরে শিউলি তুলি। ঠাকুমার হাতে সাজি। সাজিতে তুলে দিলে হাতে শিউলির গন্ধ। সাজি ভরলে ঠাকুর ঘরে মালা গাঁথবেন ঠাকুমা। সাদা সুতো বয়ে নেমে আসবে শিউলির দল। সুতো রেঙে উঠবে শিউলির বৃন্তের রঙে। ঠাকুর ঘরে বইবে শিউলির গন্ধ… মায়ের গন্ধ।

বাবা আজ তর্পণ করবেন। ঘাটে বসে দেখব আঁজলা ভরে জল তুলে বাবা ঢেলে দেবেন জলে। মুখার্জিকাকু মন্ত্র পড়বেন। কোসা থেকে জল অর্ঘ্য দেবেন বাবা। স্নান সেরে দাদুর ছবিতে দেবেন নিজের হাতে গাঁথা টগর ফুলের মালা।

হক স্যর রাজুদাদার কাছে খবর পাঠিয়েছেন… ওঁর বাড়িতে যেতে হবে। ঝন্টুদাদের দোতলা বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকেন স্যর। গুটিগুটি যেতেই ডেকে বসালেন। কাকিমণি হাতে তুলে দিলেন দুটো শারদ সংখ্যা। পুজোর উপহার। নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে পাতা উল্টাতেই বিজ্ঞাপনের পাতাজুড়ে মায়ের মুখ… পাতার নিচে শিউলি ফুল।

হক স্যর চলে গেছেন বহুদিন। কাশফুল চলে গেছে বহুদূর। শিউলি গাছের জায়গায় এখন ফ্ল্যাট বাড়ি। শরতের আকাশজুড়ে বর্ষার দাপাদাপি। সাদা তুলোকে ধাক্কা দিচ্ছে কালো মেঘ। নীল আকাশ দূরে স্থির।

প্রাত্যহিকী অবশ্য শরতের চিঠি পড়েন। মহিষাসুরমর্দিনী সরণিতে এখনও চণ্ডীপাঠ করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পুজোর অনেক আগেই শারদ সংখ্যা আসে। সেখানে মায়ের মুখ, শিউলি মেলে না।

এই মহালয়ায়… বাবা নেই একবছর। তবে আমার মধ্যে বাবা পিতৃতর্পণ করবেন আমি যতদিন আছি। আমার আঁজলায় মিশে থাকবে বাবার হাত। বাবার ছবিতে থাকবে আমার গাঁথা মালা।

পুজো আসবে। বড় কথা মা আসবেন। সবার মন ভালো করে সেই কৈলাস থেকে আসবেন ঘরের মেয়ে- স্নেহময়ী মা। সকাল হলে তাই ছেলেকে নিয়ে শিউলি খুঁজতে বেরোব। ওর হাতে দেব শিউলির স্নিগ্ধ ফুল… কে জানে কাশফুলের মতো কবে বহুদূর চলে যায়!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top