খেলনা গাড়ি— শুভদীপ মল্লিক

Prose

বহু বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স অনেকটাই কম। আর পাঁচটা বাচ্চার মতো জম্নদিন নিয়ে আমার মনেও যথেষ্ট উৎসাহ থাকত। প্রতি বছর অপেক্ষা করে থাকতাম কবে সেই দিনটা আসবে। তার কারণ অবশ্য ছিল দুটো। প্রথমত, জম্নদিনে ভালমন্দ খাওয়া। আর দ্বিতীয়ত, অনেক অনেক উপহার পাওয়া। সেই রকমই কোনও এক জন্মদিনে আমার এক দিদির কাছ থেকে একটা গাড়ি উপহার পেয়েছিলাম। গাড়িটা ছিল লাল রঙের। যাকে বলে রিমোট কন্ট্রোলড কার। মনে আছে, সেবছর যা যা উপহার পেয়েছিলাম তার মধ্যে ওই গাড়িটা আমার মনে বিশেষ একটা জায়গা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে প্রায় সারাদিনই আমি সেটা নিয়ে পড়ে থাকতাম। এর জন্য মায়ের কাছে বকাও খেয়েছি বিস্তর। কিন্তু যতদিন গিয়েছিল গাড়িটার প্রতি আমি ক্রমেই কেমন যেন আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম! যাই হোক, এইভাবে সপ্তাহখানেক কাটল। 

একদিন রাতের কথা। যতদূর মনে পড়ছে সময়টা কালীপুজোর কিছু আগে। কলকাতা শহরে ঠান্ডার আমেজ চলে এসেছে। খাওয়া দাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছি। ঘর অন্ধকার। বিছানার কিছুটা দূরে একটা টেবিলে নেশা ধরা গাড়িটা রাখা। ওটার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। রাত তখন ক’টা হবে জানি না। হঠাৎ একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। কান পেতে শুনলাম, শব্দটা হচ্ছে মাটিতে। এই শব্দ তো আমার অতি পরিচিত, প্রিয় লাল গাড়িটার! কেউ যেন গাড়িটা চালাচ্ছে! তার ফলেই গাড়িটা একবার খাটের তলায় যাচ্ছে, আবার সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে! মধ্য রাতের অন্ধকারে ওই শব্দ আমার হাত-পা অবশ করে দিয়েছিল। বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা ছিল না। এদিকে একটানা একইভাবে মাটিতে গাড়িটা চলছেই…। থামার কোনও লক্ষণ নেই। আতঙ্কে আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, চিৎকার করে মাকে ডাকি। কিন্তু চেষ্টা করেও গলা থেকে কোনও শব্ধ বেরোল না। কে যেন এক অদৃশ্য শিকলে আমার হাত-পা-মুখ বেঁধে দিয়েছিল! 

ঠিক কতক্ষণ এই আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম খেয়াল নেই। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। ধরফড় করে উঠে পড়লাম। তখন অবশ্য সকাল হয়ে গিয়েছে। আলোয় ভরে গিয়েছে গোটা ঘর। বিছানায় কিছুক্ষণ বসার পর চোখ পড়ল গাড়িটার দিকে। গতকাল রাতে যেভাবে টেবিলে রাখা ছিল সেভাবেই স্থির। বিছানা থেকে নেমে ভয়ে ভয়ে সেটার দিকে এগিয়ে গেলাম। কোনও রকমে গাড়িটা হাতে নিয়ে মাটিতে রাখলাম। তারপর রিমোটের সুইচ টিপলাম। কিন্তু গাড়িটা চলল না। গাড়ি, রিমোট নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর দেখলাম রিমোটে ব্যাটারি নেই! তাহলে? বুকটা ছ্যাঁদ করে উঠল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top