A short story by Kishore Ghosh

শর্ট ফিল্ম: পলাশ রঙের তিল—কিশোর ঘোষ

“জানিস, তোর থেকে আমি পাঁচ বছরের বড় বসন্ত, মানে পাঁচ বছরের বড় দুঃখ।”, পড়ন্ত বিকেলে পলাশতলায় বসে বলল তৃণাদি।
উত্তরে আমি বললাম, “এমন নীল শাড়ি, সাদা ব্লাউজ পরলে তোমাকে না শান্তিচুক্তি পরবর্তী গাজার আকাশের মতো দেখায়! নীল আকাশে সাদা মেঘের পতাকা! যেখানে বোমারু বিমানের জ্যালজ্যালে জরির কাজ নেই। চিলও না, অত উপরে ওড়ে শুধু জীবনানন্দের ‘হায় চিল’। দেখেছ তুমি?”
“আমার বিয়ের পর যে কী করবি!” আঁচল দাঁতে চেপে, চোখ মাটিতে নামিয়ে বলল কুঠিঘাটের বিকেলের মতো ছিপছিপে সুন্দর তৃণাদি।
উত্তরে আমি হাফ পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নিজেকে ধরালাম। তারপর বললাম, “কান্না বাই লেন বলে একটা ঝকঝকে রাস্তা বানিয়েছে হাত কাটা বুম্বাদা। বুঝলে। আমাদের পাড়ার উঠতি নেতা। আমি নিয়ম করে ওই রাস্তা দৌড়ে পার হই। তার পরেই তো তোমার ঠিকানা—‘দুঃখের পাশের বাড়ি’। অপূর্ব নাম রেখেছ জীবনের!”
“তোর সব চিঠি আমি পুড়িয়ে দিয়েছি। তোর সব উপহার, আদর… মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছি। ফিনিক্স হওয়ার চান্স নেই।” কানের পিছনে চুল সরিয়ে, চুলের পিছনে অতীত সরিয়ে বলল তৃণাদি।
আমি বললাম, “জানো, আমি দেখেছি— প্রত্যেক মেয়েকে কোনও না কোনও ফুলের মতো দেখতে। অবশ্যি স্বভাব ও চেহারা অনুযায়ী আলাদা আলাদা। কেউ গোলাপ, কেউ টগর, কেউ কামিনী। রাগি মেয়েরা এক্কেবারে জবা। তুমি কিন্তু শিউলি…আমার ভোরবেলা রঙের পৃথিবী।”
“বিয়েতে তোকে নেমন্তন্ন করব না।” ঠোঁট কামড়ে বলল তৃণাদি।
উত্তরে বললাম, “তোমার শ্বশুরবাড়িতে উঠোন আছে? শান বাঁধানো না, প্রেমিকের মতো। মাটির। অল্প বর্ষায় জল জমে আকাশের আয়না হয়। বেশি বৃষ্টি হলে কাগজের নৌকো ভাষার মতো নদী হয়। আজকাল তো থাকে না। ঘর থাকলেও উঠোন থাকে না মানুষের! এক ফালি ছাদ আছে নিশ্চয়ই! তবে টবেই পুঁতো একটা পলাশ গাছ। জানো তো এ পৃথিবীতে একমাত্র পুরুষ ফুল পলাশ!”
“লাল না, সবুজ বেনারসি পরব বিয়েতে। পাড়ে থাকবে শুকনো পাতার কল্কা।” বলল তৃণাদি।
আমি বললাম, “টবে না পারলেও অসুবিধা নেই। একা… আয়নার সামনে দাঁড়ালেও আমাকে দেখতে পাবে তুমি। ঠিক দেখতে পাবে। কেবল বাথরুমের দরজাটা সমাজের মুখের উপর দরাম করে বন্ধ করে দিও। দেখবে তোমার বুকে জ্বল জ্বল করছি আমি, পুরনো দুঃখের মতো, দূরের নক্ষত্রের মতো তীব্র কাছের… একটা পলাশ রঙের তিল।”
“জানিস, তোর থেকে আমি পাঁচ বছরের বড় বসন্ত, মানে পাঁচ বছরের বড় দুঃখ।”, নিজেকে রিপিট করল তৃণাদি।

ডিরেক্টর বললেন কাট।

শূন্য দশকের অন্যতম কবি কিশোর ঘোষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মধ্যমগ্রামে। পেশায় সাংবাদিক। ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উট-পালকের ডায়েরি’। এরপর একে একে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ—‘সাবমেরিন’ (২০১৫), ‘বিবাহ উৎসব’ (২০২২), ‘দীর্ঘশ্বাসগুলি’ (২০২৪) এবং ‘চুম্বনের আগের স্টপেজ’ (২০২৬)। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে কবির গদ্যগ্রন্থ ‘অফসাইড’। ‘উট-পালকের ডায়েরি’র জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি যুব পুরস্কারে মনোনিত হন কিশোর। পেয়েছেন দৌড় সম্মান। কবিতা, গদ্যের পাশাপাশি তাঁর গল্পও পাঠকসমাজে জনপ্রিয়। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top