তখন অন্ধকার এমন ছাগলছানার মত চপল ছিল না। একবার ঝুপ করে নেমে এলে বুড়ো ঠাকুদ্দার মত জমে বসে যেত। ভোর হওয়া ইস্তক আর নড়ত না।
জমাট বলে জমাট! এখনকার মত খেলো অন্ধকার নয়! এখন আবার অন্ধকার বলে কিছু হয় নাকি ? কুয়াশা ছাওয়া আকাশ, ধোঁয়া ভরা আকাশ- কণায় কণায় আলোর বিচ্ছুরণ। অ্যাকুরিয়ামের মত ঘষা আলোয় ভরা আকাশ। আকাশ ভরা তারাদের মুখ ভার! মানুষের অন্ধকারে মানুষেরও মুখ ভার । লোডশেডিং নামে যে মিষ্টি আদুরে শব্দখানা, সেও তো প্রায় অবলুপ্তির পথে!
সেসব ছিল বটে আমাদের ছোটবেলায়- লোডশেডিং এর আঁধার ছিল, ভোল্টেজ ড্রপের আবছায়া ছিল, ইলেকট্রিসিটির বালাই ছাড়া ঘুটঘুট্টি রাত ছিল। ছিল তো আরো কত্ত কী! লিস্টি দিতে গেলে মাইল খানেক লম্বা হয়ে যাবে।
অন্ধকারও কি এক রকম? বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে এলেই মশার ঝাঁক অন্ধকারের প্রেয়ার জুড়ত। দুষ্টুরা উঁ..উঁ..উঁ..উঁ..উঁ.. শব্দ করে সেই ঝাঁক টেনে নিয়ে যেত এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। এইসব হতে হতেই মাঠের ধারে কচুর বনে যেই না সমস্বরে ব্যাঙের ডাক উঠতো, অমনি শুরু হতো ঝিঁ ঝিঁ পোকার কোরাস! আর ঠিক তক্ষুণি এই লম্বা দিনখানা সারা দিনের ক্লান্তির ঝোলা ধপ করে নামিয়ে রেখেই ঝপ করে ঘুমিয়ে পড়তো অন্ধকারের কোলে।
মাঠের ধারে কচুর বনে অন্ধকার -পাথরের মত জমাট বাঁধা। মাঝমাঠে অন্ধকার একটু যেন ফিকে। বাগানের লম্বা লম্বা গাছগুলোর নিচে, বাঁশঝাড়ের পায়ের কাছে কেমন গা ছমছম অন্ধকার!
পিঠোপিঠি ভাই বোনের মত অন্ধকারেরও রকম ফের আছে। শহরের একরকম, শহরতলির একরকম, গ্রামের একরকম, রান্নাঘরের একরকম, বসার ঘরে একরকম, বাথরুমে একরকম, সিঁড়ির নিচে, চিলেকোঠায় আরেক রকম। তাদের রূপ বর্ণনা করতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে, অথচ সেই মায়াবিনীর ছায়াটুকুও ধরা যাবে না।
মায়াবিনী বল্লুম কেন? সে আঁধারের বুক থেকে একটুখানি আলোর মায়া যে না দেখেছে সে তো একথা মালুম করতে পারবেনি বাপ! সেই আলোর মায়ায় অন্ধকার আরো গাঢ় হয়।
অন্ধকার গাঢ় করে তার কোল ছুঁয়ে যে ঠান্ডা আলোটুকু মিটমিট করছে ঘরের দাওয়ায়, সে হতে পারে কুপির। কাচের শিশির ঢাকনায় ছ্যাঁদা করে সলতে ঢোকানো। শিশি ভর্তি তেল। তেল চুঁইয়ে আসে সলতেয়। সলতে পুড়ে যায় হলুদ আগুনে। দপ দপ করে আলো। আলোয় ছায়ায় মায়াবিনী রাত তখন আয়েশ করে চুল বাঁধে।
আর সেই আলো ঘিরে যদি কচিকাঁচাদের পড়াশুনোর কল্লোল, তবে হতেই পারে সে আলোর নাম হারিকেন। ‘তেত্রিশ বছর কেটে গেল’- কেউ আজ হারিকেন জ্বালেনি। অথচ ধরাই যাক ঠিক তেত্রিশ বছর আগে সন্ধ্যে ঘনালো, মা অথবা দিদি এবার হারিকেনের চিমনি মুছবেন। শুকনো কাপড় তিন আঙুলে জড়িয়ে মুছে নেবেন চিমনির ভিতরের ভুষোকালি। তারপর উনুনের ছাই দিয়ে অন্য কাপড়ে মোছা হবে । শেষে চিমনির একদিকে মুখ রেখে ভাপ দেবেন, ফের মুছবেন। আহ্লাদে এবার কাচের গা থেকে আদুরে শব্দ উঠবে। ইংরেজি এক্স এর মত তারের বাঁধনে বাঁধা পড়বে চিমনি। দীপ শলাকা থেকে আগুন চুঁয়ে উঠবে সলতেয়। মুকুটের হাতল টেনে তুলে আলতো করে চিমনিকে যথাস্থানে বসিয়ে দেবেন মা- মিষ্টি আলোর চার ধারে গোল হয়ে পড়তে বসবে ছোটরা। পড়ুয়াদের চোখে যাতে আলোর জ্বলন না হয় তাই টুকরো কাগজ আড়াআড়ি গুঁজে দেবেন বাবা তারের এক্স আর চিমনির মাঝখানে। আবছা আলোয় দুলে দুলে চলবে পড়াশুনো- পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল। দেয়ালে দুলবে লম্বা লম্বা মায়াবী ছায়া। হ্যারিকেনের আলোয় জমবে ছায়াবাজি। আঙুলের মুদ্রায় অন্ধকার দেওয়ালে ফুটে উঠবে ঘোড়া, কুকুর, হাঁস, হরিণ, মানুষের মুখ। পড়তে পড়তে দুষ্টুরা হয়তো এবার মশা মেরে বসিয়ে দেবে হারিকেনের তপ্ত ছাতে! কেউবা আবার ডট পেনের ধাতব ডগা হারিকেনে গরম করে ছেঁকা দেবে অন্যজনকে! হুলুস্থুলুতে হয়তো বা কাত হয়ে পড়বে হারিকেন! অতঃপর যা হওয়ার তাই!
রান্নাঘরে হারিকেনের আলো-আঁধারিতে রান্নার গন্ধ ভাসবে। ওদিকে দিদার ঘরে পাটের গাট্টি একটার উপর একটা রাখা। ইয়া উঁচু। হারিকেনের আলোয় সেই মালভূমিময় দাপাদাপি চলবে। পৈঠায় কালি পড়া হারিকেনের আলোয় বড় মামা ভূতের গল্প বলবেন- অন্ধকার পথে বাঁশ ঝাড়ের দু’দিকে দুই পা দিয়ে পথ আটকে আছেন অশরীরি! গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে শুনবে ভাই বোন সব্বাই ! এরপর ছমছমে অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে বাথরুমে যেতে হলেই খোঁজ পরবে মায়ের!
হারিকেন মধ্যবিত্ত বাড়ির সম্পত্তি। হারিকেনের সংখ্যার সাথে বাড়ির স্বাচ্ছল্য সমানুপাতিক। শুনেছি আমার দাদুকে যখন তার দাদা ভিন্নভাত করেন, দাদুর ভাগে পড়ে কেবল পূবের ভিটে আর একখানা হারিকেন। সম্পত্তি নয় তো কি বলো তবে?
শীত গ্রীষ্ম বারো মাস হারিকেন হাতে আড্ডা দিতে যেত নরেশ কাকা। শিমুল গাছের নিচে বাঁশের মাচা। উঁচু উঁচু বাঁশ থেকে তিনটে হারিকেন ঝুলছে। মাচায় জমে উঠছে তাসের আসর। হারিকেনের আলো কি পৌঁছচ্ছে শিমুলের ফুলে?
নাঃ! ফুল অব্দি হারিকেনের আলো যায় না। ফুলে ফটফট করে চাঁদের আলো। খোলা মাঠে আঁধার ছেঁড়ে না হারিকেনের আলোয়। এ তো আর আজকের হ্যালোজেন নয়! বাইরের অন্ধকার মুছে দেবে, তাকানো যাবে না, তাকালেই অন্ধকার!ভিতরে অন্ধকার! তখন মিঠে আলো যেমন ছিল বাইরে তেমন ছিল ভিতরে। ‘বাইরের তরলায়িত অন্ধকার ভেতরের মানুষটাকে সহজে অন্ধকার করে দিতে পারত না। এখন বাইরে হ্যালোজেন আছে। কিন্তু কেন কি জানি ভেতরটা নিকষ অন্ধকার। এখন আলোকিত পৃথিবীর যেন চার ভাগই জল। জীবন জলে গেছে।’
মাঠের বুকে চোর কাঁটা হাওয়ায় দোলে। অন্ধকার ঢেউ। পড়াশুনো সেরে পৈঠায় বসে সে সব দেখি। বাবার কাছ থেকে তিন সেলের টর্চ নিয়ে বোতাম টিপি চাঁদের দিকে। আলোর পথ উঠে গিয়ে মিশে গেছে জোছনায়। জোছনা মাখা আমের বোল পেরিয়ে কত বড় আকাশ!
আকাশ ভরে কত আলোর ফুল ফুটে আছে তারাদের মতো!

শাশ্বত কর মূলত কবিতা লেখেন। একটি সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক। বিভিন্ন সাময়িক পত্রে দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা দুই, প্রকাশিত ছোটদের উপন্যাসের বই দু’টি, ছোটদের গল্প সংকলন একটি। ন্যাশনাল স্কলারশিপ সহ পেয়েছেন বিধানশিশু উদ্যান সম্মান, কলকাতা রোটারি ক্লাব কর্তৃক প্রদত্ত সম্মান, একপর্ণিকা পত্রিকা থেকে ছোটদের উপন্যাস লেখার জন্য পরপর দু’ বছরের বর্ষসেরা সম্মান পেয়েছেন।



