Arpan Das interviews theatre legend Badal Sarkar

‘আজকের আদর্শ নাটক ‘সারারাত্তির’: একান্ত ‘সাক্ষাৎকারে’ বাদল সরকার—অর্পণ দাস

নমস্কার বাদলবাবু। কেমন আছেন?
ভালো আছি। দিব্যি আছি।

নতুন কোনো নাটক লিখছেন?
নতুন? নতুনের কী দরকার? ত্রিংশ শতাব্দী কি পুরনো হয়ে গেছে?

তা ঠিক। বর্তমান সময়ে যেন এই নাটকের গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে।
তাই তো কথা ছিল। এ আদি পাপ। আমেরিকা আস্ফালন করবে। রাশিয়া চোখ রাঙাবে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলবে। আর আমরা অন্ধ হয়ে বালির মধ্যে মুখ গুঁজে থাকব।

এই অন্ধত্ব ঘোচাতে আজকের থিয়েটারের কী করা উচিত ছিল?
অনেক কিছুই। থিয়েটার করতে পারেনি। এখন সব বাসি খবর। দেশে দেশে ধর্মের নামে দাঙ্গা চলবে। সংখ্যালঘুদের পিটিয়ে মারা হবে। আর থিয়েটার চুপ করে ঠান্ডা ঘরে হাওয়া খাবে।

বাংলা থিয়েটার রাজনীতি বিচ্যুত হয়েছে বলছেন?
সে বহু আগেই হয়েছে।

আর থার্ড থিয়েটার? তার কাজ ছিল নতুন ভাষা তৈরি করার। সে কি প্রতিবাদের নতুন ভাষা দিতে পেরেছে?

থার্ড থিয়েটারের একার দায়িত্ব ছিল না। আমরা একটা রাজনৈতিক আন্দোলন গড়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম থিয়েটার হবে সবার জন্য। মানুষ-মানুষে যোগসূত্র। সজীব প্রাণ। জীবনের নগ্ন কঠিন চেতনা। একদিনের প্রতিদিনের। আমাদের ইশতেহারে সেটাই বলা হয়েছিল। কিন্তু থিয়েটার প্রতিষ্ঠানের দাস হয়ে গেল। সমাজের কথা, সবার কথা বলার দায় নিল না। সিপিএমের রাজনীতি মানুষকে ভেঙে দেখেছে। ছোট ছোট খোপে ভরেছে।

এখন?
এখন তো সাঁড়াশি আক্রমণ। ঘরে তৃণমূল। বাইরে বিজেপি। বাঁচলে ভোট৷ মরলে লাশ। ভোমারা আজও না খেয়ে মরে। আর আরাবল্লির মাথা কাটা হয়। তোমরা ভাবছ, ইন্টারনেটে পৃথিবী ছোট হয়েছে? হয়নি। পৃথিবীতে বৈষম্য কম দেখানোর যন্ত্র বেড়েছে। তার অস্তিত্বকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। আজকের পুঁজি সেই কাজ করে।

বেশ। তাহলে এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সমাজ পরিবর্তনের ভাষা কী হবে?

শিল্প-সংস্কৃতির কোনো স্বয়ম্ভু রূপ নেই। অর্থনীতি-সমাজনীতি-রাজনীতি অবস্থায় তা বদলায়। নাটকে রাজনীতির গোড়ার কথা কখনই বদলাতে পারে না। কারণ মানুষের সমস্যার গোড়ার কথা বদলাচ্ছে না। সে এই সমাজব্যবস্থায় খুশি নয়। সে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সে পরিবর্তনও চাইছে। সিস্টেমের স্থিতাবস্থা চায় কারা? টাটা-বিড়লা-আম্বানিদের মতো পুঁজিপতিরা। তারা চাইবে সমাজ তাদের ক্রীড়নক হিসেবে থাকুক। আমার রাজনৈতিক ধারণা বলে, হঠাৎ একদিন এই ব্যবস্থাটা বদলানো যায় না। নির্বাচনের মাধ্যমে তো নয়ই।

তবে?
সমাজ সচেতনতা বলে একটা শব্দ বোধহয় ক্লিশে হয়ে গেছে। কিন্তু ওটাই সম্বল। সিস্টেমের মাথার লোকেরা জানে পরিবর্তন স্বাভাবিক। সেটা আটকাতে ওদের পুলিশ আছে, সৈন্য আছে। কিন্তু সব সময় প্রয়োগ করে না। আসল অস্ত্র মগজ ধোলাই। তোমরা তো ফেসবুক-টুইটার করো। কীসব ভাইরাল হয়। ওগুলো কি জনমত গঠনের অস্ত্র? না। ওগুলো ইস্যুভিত্তিক গণ্ডিতে বেঁধে রাখার যন্ত্র।

অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। আপনার ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ নাটক থেকে সিনেমা হয়েছে। সেটা নিয়ে কী মতামত?
স্ট্রিট স্মার্ট। ঝকঝকে। এই ধরনের সিনেমা আজকাল লোকজন পছন্দ করে। তার উপর দেখলাম, একটা গান বেঁধেছে, ‘জয় রাজা, জয় বাদল’। আমাকেই বোধহয় রাজা বলছে। সে ভালো। কিন্তু সিনেমা দিয়ে নাটক মনে করানোই বুঝি আজকের যুগের বৈশিষ্ট্য? সাল-বচ্ছর পর্যন্ত গুলিয়ে ফেলেছে। আমার কীরকম একটা লাগছিল। ‘এক যে ছিল নাট্যকার’ বলে তো আসলে লোকে ভুলে গেছে প্রমাণ করে দেওয়া হল।

নির্মাতাদের উদ্দেশ্য তো সৎ হতে পারে। ভালো গল্পের চলচ্চিত্রায়ন হলে মন্দ কী?
মন্দ কেন হবে? অতীত আঁকড়ে ধরার বিলাসিতায় আমি বিশ্বাস করি না। পরিচালক সেই ক্ষয়িষ্ণু আদর্শের গোড়া ধরে নড়িয়ে দেন। আবার পুরো ধাক্কা দেন না। পুঁজিবাদ, পুঁজিবাদ বলে চিৎকার করেন না। একটা মাঝামাঝি অবস্থান নেন। তাতে যে নাটকের রাজনীতিটা হারিয়ে যায়। সেটাও উদ্দেশ্য নয় তো? পরে তো দেখলাম মাঝামাঝি জায়গায় না দাঁড়াতে পেরে পরিচালক কী বিপদে পড়লেন!

শেষ প্রশ্ন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে কি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ প্রযোজনা করতে মন চায়?
না। এখন সবাই অমল-বিমল-কমল। ইন্দ্রজিৎ কেউ নেই। কয়েক হাজার বছর ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরেছে- আমি কে? সেই প্রশ্নটাও গায়েব। নিজেকে কেউ বলে না, ‘তুমি আত্মহত্যা করোনি কেন?’ এখন সবাই ‘সারারাত্তির’-এর ওই বৃদ্ধটা। নিজের কামনাগুলোকে নিয়ে ঘরে পচে মরছে। চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে সে একা জেগে থাকে- সারারাত্তির, সারারাত্তির, সারারাত্তির।

অসংখ্য ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
তোমরাও। ভালো থাকার দায়-দায়িত্ব তোমাদেরই।

(প্রয়াত থিয়েটার কিংবদন্তি বাদল সরকারের একটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকার)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top