Dharmendra a face of independent India Written by Joy Chatterjee

নবীন ভারতের লড়াকু মুখ ধর্মেন্দ্র—জয় চট্টোপাধ্যায়

“The web of our life is of a mingled yarn, good and ill together.”

উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘All’s Well That Ends Well’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে এই কথাটি একজন অভিজাত ব্যক্তি অন্য একজন অভিজাত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন। যেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, একজন মানুষের জীবন কখনও শুধুই ভালো বা শুধুই মন্দ দিয়ে তৈরি হয় না। ভালোর সঙ্গে মন্দ, সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থতা, পুণ্যের সঙ্গে পাপ। এসব মিলিয়েই তৈরি হয় জীবন। ধর্মেন্দ্রের নায়ক জীবন যেন এই কথারই জীবন্ত ব্যাখ্যা।

ধর্মেন্দ্রকে নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বোঝা দরকার তিনি কেন ‘মেগাস্টার’, ‘সুপারস্টার’-এর তকমা না পেয়ে শুধুই ‘হিরো’ হিসেবেই এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। উত্তরটা শুধু তাঁর অভিনয়ের মধ্যেই লুকিয়ে নেই, রয়েছে সমকালীন বাস্তবতার মধ্যেও। ১৯৬০ সালে অর্জুন হিঙ্গোরানির ‘দিল ভি তেরা, হাম ভি তেরে’ ছবির মধ্য দিয়ে বলিউডে পা রাখেন ধর্মেন্দ্র কেওয়াল কৃষ্ণ দেওল। মনে রাখতে হবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে সত্তরের দশক ভারতের জন্য ছিল ভাঙাগড়ার সময়। নেহেরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু, ইন্দিরা গান্ধীর উত্থান, ভারত-পাক যুদ্ধ, জরুরি অবস্থা। একেরপর এক ঘটনায় স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন বাস্তবের চাপে অনেকটাই ক্ষয়ে গিয়েছে। ‘গরিবী হঠাও’ স্লোগানে গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে মানুষের ঢল, অথচ সেখানেও কাজের নিশ্চয়তা নেই। ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণের বেঁচে থাকা দায়। রাজনীতি অস্থির, সামাজিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এই সময়ের হিন্দি ছবির দর্শক আর দেবতার মতো কোনও নায়ক খুঁজছিল না। তারা খুঁজছিল নিজের মতো কাউকে—যে লড়াই করে, ক্লান্ত হয়, তবু হাল ছাড়ে না। ঠিক এই জায়গাতেই ধর্মেন্দ্র আলাদা হয়ে যান তাঁর সমসাময়িক নায়কদের থেকে।

সেই সময় পর্দা কাঁপাচ্ছেন রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেবানন্দ, রাজেন্দ্রকুমার থেকে গুরু দত্ত, জয় মুখার্জি, ভারতভূষণ প্রমুখদের মতো তারকারা। এঁদের মাঝেই ধর্মেন্দ্র হাজির হন একেবারে সাধারণ চেহারায়। লম্বা, শক্ত চেহারা। অথচ চোখে এক ধরনের মায়াবী চাহনি। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি কখনও ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ নয়। তিনি মারপিট করেন, কিন্তু নৃশংস নন। প্রেম করেন, কিন্তু প্রেমে সব সময় সফল হন না। তাঁর অভিনীত চরিত্ররা জীবনের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে চলে।

১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ও. পি. রালহান ‘ফুল অউর পাত্থর’ ছবিতে শংকর চরিত্রে ধর্মেন্দ্র এই নতুন ধরনের নায়কত্ব প্রথম বড় আকারে দর্শকদের সামনে আসে। ছবিতে শংকর একজন অপরাধী। সমাজের চোখে সে ‘পাত্থর’, কিন্তু যখন তিনি একজন অসুস্থ বৃদ্ধার সেবা করেন, তখন তাঁর ভিতরের নরম মানুষটা ধীরে ধীরে সামনে আসে। ছবিতে ধর্মেন্দ্র নিজেকে নায়ক বানাতে গিয়ে কোনও অতি নাটকীয়তা চাপিয়ে দেননি। চোখের দৃষ্টি, স্বল্প সংলাপ বা সংলাপের মাঝখানে থমকে যাওয়া—এই সব ছোট ছোট ভঙ্গিতেই চরিত্রটা তৈরি করেন। বাস্তবে তখন শহরে কাজের আশায় এসে যারা ভুল পথে পা দিয়েছে, অথচ পুরোপুরি ভেঙেও পড়েনি, ছবির শংকর যেন তাদেরই প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। সত্তরের দশকে এসে ধর্মেন্দ্রের এই চরিত্র চিত্রণ আরও খানিকটা বিস্তৃত হয় সামাজিকভাবে। ১৯৭৫ সালে রমেশ সিপ্পির ‘শোলে’ ছবির বীরু চরিত্রে ধর্মেন্দ্র শুধু একজন ডাকাত নয়, সে বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। ছবির অন্যতম ‘প্রোটাগনিস্ট’ অমিতাভ বচ্চন ওরফে জয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক আবেগের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বীরু হাসে, গান গায়, বাসন্তীর প্রেমে পড়ে, আবার বিপদের মুখে একাই সব সামলাতে চায় না। এই যৌথ নায়কত্বের ধারণা আসলে সেই সময়ের সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

যখন মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, একা কেউ নায়ক হতে পারে না। দেশে জরুরি অবস্থার ঠিক আগে মুক্তি পাওয়া ‘শোলে’ তাই এত গভীরভাবে মানুষের মনে দাগ কেটেছে। আজ‌ ৫০ বছর পরেও যা সমানভাবে জনপ্রিয়তা কুড়িয়ে যাচ্ছে। এরপর সেই বছরেই মুক্তি পাওয়া হৃষিকেশ মুখার্জির ‘চুপকে চুপকে’ ছবিতে ধর্মেন্দ্র যেন নিজের ইমেজকে আবারও ভেঙে দেন। যেখানে তিনি আবারও স্ক্রিন শেয়ার করেন অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। পরিমল ত্রিপাঠীর চরিত্র কোনও শক্তপোক্ত অ্যাকশন হিরো নন। তিনি শিক্ষিত, ভদ্র, রসিক মানুষ। পরিচয় বদলের এই খেলায় তিনি আনন্দ পান, কিন্তু কাউকে আঘাত করেন না। সত্তরের দশকের সামাজিক ক্লান্তির মধ্যে এই চরিত্র দর্শককে দেখায়, নায়ক মানে শুধু লড়াই নয়, কখনও হাসিও প্রতিরোধের ভাষা হতে পারে।

দুলাল গুহ পরিচালিত ‘প্রতিজ্ঞা’ ছবিতে ধর্মেন্দ্রের চরিত্রের নাম ছিল ধ্রুব সিং। গ্রামীণ বাস্তবতার মধ্যে যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক মানুষ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত সুখ পর্যন্ত বিসর্জন দেয়। গ্রামীণ ভারতের দারিদ্র্য, শোষণ আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার মধ্যে এই চরিত্র এক নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে ওঠে। ধর্মেন্দ্র এখানে শক্ত, কিন্তু নিষ্ঠুর নন। মানসিকভাবে দৃঢ়, কিন্তু অহংকারী নন।

এরপর ১৯৭৭ সালে পরিচালক মনমোহন দেশাইয়ের ‘ধরম বীর’ ছবিতে দ্বৈত ভূমিকায় দেখা যায় ধর্মেন্দ্রকে। ধরম সিং ও বীর সিং। একদিকে রাজকীয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন। এমন দ্বৈত সত্বাই আসলে পর্দায় ধর্মেন্দ্রের জনপ্রিয়তার মূল রহস্য। দর্শক একসঙ্গে পায় রূপকথার স্বাদ আর বাস্তবের ছোঁয়া। জরুরি অবস্থার পরবর্তী সময়ে, যখন দেশ নৈতিক দিশা খুঁজছিল, এই ধরনের চরিত্র‌ই সাধারণ মানুষকে আশ্বাস দেয়, সব কিছু ভেঙে গেলেও সম্পর্ক আর নৈতিকতা বাঁচিয়ে রাখা যায়।

গোড়ার দিকে এই সব চরিত্র‌ই ধর্মেন্দ্রের এমন এক নায়কসত্ত্বা তৈরি করে যা সমাজের বাইরে দাঁড়িয়ে নয় বরং সমাজের ভেতর থেকেই কথা বলে। তাঁর চরিত্র ভুল করে, দ্বিধায় পড়ে, আবার সেই দ্বিধা নিয়েই এগিয়ে যায় সামনে। ঠিক যেমন শেক্সপিয়রের কথায় বলা হয়েছে—ভালো আর মন্দ মিলিয়েই মানুষের জীবন। ধর্মেন্দ্রের নায়কত্ব কোনও অলীক স্বপ্ন দেখায়নি। বরং সংগ্রামের মধ্যেও বেঁচে থাকার মন্ত্র শেখায়।

পরিচালক প্রকাশ মেহরা একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ধর্মেন্দ্রের চোখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু হাল ছাড়ার ইচ্ছা ছিল না। এই দুইয়ের মিশ্রণটাই তখনকার ভারতের মুখ।

ধর্মেন্দ্রের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি চরিত্রকে বড় করে তোলেননি; নিজেকে ছোট করে চরিত্রের মধ্যে ঢুকিয়েছেন। তাই তাঁর অভিনয় কখনও ছায়াপথের মহাতারকা হয়ে ওঠেনি। উঠেছে আর পাঁচটা চেনা মুখ হয়ে। পাশের বাড়ির ছেলে, সহযাত্রী, সহযোদ্ধা। শেষে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই লাইনটাই মনে পড়ে, ‘ মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও…’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top