
‘গাজা গাজা করে খুব, পুজোর ভোগ দিলে ওরা আবার কিছু মনে করবে না তো?’
‘মনে করবে! তাহলে দিও না।’
সুলেখাকে জবাব দিয়েও মনে খচখচ শিশিরের। পুজো হয়েছে, ফ্ল্যাটবাড়ির সবাইকে ভোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে মনে করার কী আছে! তা ছাড়া গাজার কথা ভেবে কলকাতাসুদ্ধ লোক খাওয়া-দাওয়া সব মাথায় তুলে বসে আছে নাকি!
তবু সুলেখা জিজ্ঞেস করল। আলগোছে। নিশ্চয়ই ওর মনে হয়েছে, এই ভোগ খাওয়ানোর ভিতর এক রকম বাড়তি ব্যাপার আছে। যা না করলেও চলে। কথাটা যে শুধু তাদের জন্যে খাটে তা নয়। চোখের সামনে যারা গাজা দেখছে, তারা সংযমের পরিচয় দিতেই পারত।
থার্মোকলের থালা-বাটিতে খিচুড়ি, তরকারি, ভাজাভুজি সাজাচ্ছে সুলেখা। সব ফ্ল্যাটের দরজায় দরজায় বেল বাজিয়ে পৌঁছে দিতে হবে। সে-কাজ শিশিরেরই। এখন ওরা যদি জিজ্ঞেস করে, ‘এহ্ শিশিরবাবু, আপনিও শেষ পর্যন্ত!আপনাকে তো অন্য রকম ভাবতাম।’
শিশির জবাব খুঁজতে থাকে। মোক্ষম সময়ে মনে পড়ে, গত শনিবার ওদের বাড়িতে রাতে বেশ জোরে গান চলছিল। হিন্দি গান। ঢিপ্ ঢিপ্ করে সাউন্ড সিস্টেমের আওয়াজ বন্ধ দরজার বাইরেও ছড়িয়ে ছিটকে পড়ছিল। নিশ্চয়ই পার্টি-ফার্টি চলছিল। শিশির ঠিক করে নেয়, বলবে— ‘বাহ্ রে আপনারা যে পার্টি করেন, তার বেলা? শুধু লক্ষ্মীপুজো করলেই দোষ! গাজা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলেই বুঝি খুব মানবিক হওয়া যায়!’
তারপর ভাবে এত কথা গুছিয়ে ঠিক বলতে পারবে না। বরং বলবে, ‘কেন আপনারা পুজোর ভোগ খান না বুঝি?’ এতে বরং উচিত-অনুচিতের দিকে কথাটা গড়িয়ে যাবে। আর তাতে কোনও পক্ষেরই হার-জিত নেই। আজ অব্দি এর মীমাংসা হয়নি। মার্কস, মন্দির সব পাশাপাশি। সুতরাং কথা যদি বেড়েও থাকে, শেষে শিশির বলবে, ‘আচ্ছা পুজো-ফুজো ছাড়ুন, খাবার হিসাবেই বরং খান। সুলেখা নিরামিষ খিচুড়ি দারুণ বানায়।’
গাজার কথা কেন যে তুলল সুলেখা! এখন আবার বেশি প্রশ্ন করলে রেগে যাবে। খিদে আর খাবার প্রায়শই পাশাপাশি থাকে না। অথচ থাকার কথা।পাঁচালির গোড়াতে দুর্ভিক্ষের গল্প। খিদে তো মোক্ষম অস্ত্র। হিটলার জানত, এখনকার নেতারাও জানে। যাক্ যা বলার বলেছে, এ নিয়ে সুলেখাকে আর বেশি ঘাঁটিয়ে লাভ নেই।
একটু পরে গোছানো শেষ হলে সুলেখা বলে, ‘যাও এবার এক এক করে দিয়ে এসো দিকি।’
যে যা বলে বলুক। গা ঝাড়া দিয়ে অতএব উঠে পড়ে শিশির। দরজা অবধি লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ এঁকেছে সুলেখা। তাতে পা না পড়ে এমন সাবধানে এগোতে গিয়ে দেখে আলপনা যেন অসমান, আঁকা-বাঁকা। ভোগের থালা হাতে শিশির এখন স্পষ্ট বুঝতে পারে খিদেবিধ্বস্ত একটা মেয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেগোটা ঘরময়।
মেয়েটিকে সে কোথায় যেন দেখেছিল!



