Suto a short Story by Bitan Chakraborty

সুতো— বিতান চক্রবর্তী

মরে গেছে?

বাবান স্কুলে যাওয়ার পথে দেখল চায়ের দোকানে তুমুল উত্তেজনা। দিব্যা ভারতী কাল রাতে আত্মহত্যা করেছে। তপাদা চায়ের দাম মেটাতে মেটাতে জোর গলায় বলল, ‘আরে, আত্মহত্যা নয়, খুন… খুন!’

সারাটা স্কুল খুব মন খারাপে কাটল বাবানের। সে দিব্যা ভারতীর কোনো সিনেমা না দেখলেও তাকে চেনে। তপাদা সেই দিনই ওর একটা ইয়া বড় রঙিন পোস্টার কিনেছে মেলা থেকে। ঘরের দেওয়ালে আঠা দিয়ে লাগিয়েছে সেটা। দেওয়ালটা বাবানদের বড় ঘর থেকে দেখা যায়। পোস্টারের ঠিক নিচেই তপাদার থ্রি-ইন-ওয়ানটা বসানো। ন’টা বাজলেই সে গান চালায়। বিশ্বাত্মা, দিওয়ানা, আশিকি… বাবান সিনেমাগুলো না দেখলেও, শুনে-শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে গানগুলো।

বছর তিনেক আগে বাবানরা যখন এই পাড়াতে আসে, তপাদা তখন মুদিদোকান দিয়েছে। ফলে তপাদা কী পড়েছে, কী করেছে, কিছুই বাবানের জানা নেই। ও শুধু জেনেছে সুতোতে ছুরির মাঞ্জা দিতে আর ঘুড়িকে আকাশে সবচেয়ে ওপরে উঠিয়ে সারাটা দিন ওড়াতে আর কেউ পারে না এই পাড়ায়, তপাদা ছাড়া। দুপুর তিনটেতে ঘুড়ি টঙে উড়িয়ে তপাদা ফুটবল খেলে। কখনও বা পার্টির ঝাণ্ডা লাগাতে চলে যায়। লাটাই পুঁতে দেয় মাটিতে। পাড়ার ওর বয়সি আরও ছেলেদের সঙ্গে বাবান সারা বিকেল পাহারা দেয় সেই লাটাই। ঘুড়িটা অত ওপর থেকে দেখে ওদের। মাঝে মাঝে গোল গোল ঘোরে, বাঁদিক ডানদিক হেলে যায়। আশাপাশে অন্য ঘুড়ি আসে। কিন্তু তপাদার ঘুড়িকে কেউ কাটবার চেষ্টাটুকুও করে না। তপাদা ম্যাচে দুটো গোল করে অন্ধকার আকাশ থেকে ঘুড়িটা নামিয়ে আনে!

এপ্রিল মাসটা সারা দিন শুধু দিব্যা ভারতীর গানই বাজাল। বুধুকাকু একদিন দেড়শো গ্রাম সর্ষের তেল নিতে এসে জানতে চাইল, ‘হ্যাঁরে তপা, আর কোনো গান নেই তোর কাছে?’ তপাদা তেল মাপতে মাপতে গম্ভীরভাবে বলল, ‘না’। বাবানরা ওদের ঠাকুরদা মারা যাওয়ার শোক ভুলে গিয়েছিল দিন কুড়ি বাদে। তপাদা পারল না। সন্ধ্যা হলেই বেজে উঠতো— ‘মিলনে কি তুম কৌশিস কর না, ওয়াদা কভি না করনা…।’

কাল বিশ্বকর্মা পুজো। ভোর ছ’টায় ঘুম চোখে বাইরের কলে মুখ ধুতে এসে বাবান দেখল সমস্ত পাড়া গুজুর গুজুর করছে। বাবা পেপার ফেলে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বলল, ‘ইস, ছেলেটা পাড়ার নামও ডুবিয়ে দিল’। মা স্কুল ড্রেস পরাতে পরাতে বললো, ‘বারবার বলতাম তপার সঙ্গে মিশিস না। দেখ, কাল রাতে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ওকে’। বাবান হাঁ হয়ে শুনল। হাঁ মুখে মা এক টুকরো শুকনো রুটি গুঁজে দিল। রুটি চিবোতে চিবোতে সে পেপারটা তুলে নিল। ভেতরের পাতায় অনেকটা বড় হরফে ছেপেছে খবরটা—‘ইটখোলায় বেআইনি অস্ত্র কারখানার সন্ধান। গ্রেপ্তার তপা সর্দার’।

স্কুলের পাশে রিক্সা স্ট্যান্ডে মাইক বাজছে, ‘তুঝে না দেখুঁ তো চ্যায়ন মুঝে আতা নহি…’। আজ টিফিনের পরেই ছুটি হয়ে গেছে। এবার পাড়াতে মাঞ্জা দেওয়া হবে না। যদিও ঘুড়ির দোকান বসেছে নিয়ম করেই। বাবান বাড়ি ফেরার পথে দাঁড়িয়ে দেখল ঘুড়িগুলো। একটা ময়ূরপঙ্খী খুব পছন্দ হয়েছে। নিল না। সুতো নেই। জুতোর নিচের স্টোনচিপটাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে এল পাড়ার মোড়ে। সেটাকে এক-শটে ড্রেনে ফেলে পাড়ার দিকে তাকাতেই অবাক হল বাবান। পুরো পাড়াটাকে যেন কেউ সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে শূন্য করে দিয়েছে। কেউ কোথাও নেই।

জুতো খুলে রান্নাঘরে গেল বাবান। উনুনে মাছ ভাজা হচ্ছে অল্প তেলে। ভাত উপুড় দিচ্ছে মা। বাবানের দিকে মুখ ফিরিয়ে মা বলল, ‘হাত-পা ধুয়ে নে। একেবারে ভাত খেয়ে নিস। আর শোন, আজ খেলতে যাস না’। জামাটা খুলে এসে বাবান দেখল লক্ষ্মীমাসি এসেছে ঘর মুছতে। ঝাঁটা হাতে রান্নাঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে মা-কে বলছে, ‘মেরে ফেললে গো দিদি! তপাটাকে লকআপেই মেরে দিয়েছে। না মারলে যে আসল নামগুলো বেরিয়ে যেত!’ কলতলায় মুখ ধুতে-ধুতে বাবান দেখলো একটা কাটা সুতো কে যেন টেনে নিচ্ছে তপাদার বাড়ির ছাদের ওপার থেকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top