Andhakarer Galpo a short story by Biswadip Dey

অন্ধকারের গল্প— বিশ্বদীপ দে

এই গল্প অন্ধকারের। এই ছোট্ট লেখা আসলে থমকে থাকা খানিকটা মেঘ, একপশলা বৃষ্টি, সন্ধে নামানো বিকেল অথবা স্রেফ একটা ছায়ার।
ছুটির দুপুরের ঘুম ভেঙেছিল বিকেলের শেষ প্রান্তে পৌঁছে। বুঝেছিলাম সন্ধে নামতে শুরু করেছে। আকাশে মেঘ। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। রানাঘাটের ছেলে। ভবানীপুরের দোতলা এই ভাড়াবাড়ির নিচের তলায় থাকি। সঙ্গে আরও দু’জন থাকে বটে। কিন্তু ওরা এখন নেই। রাতে ফিরবে। আমার মতো বুধবার ওদের ছুটির দিন নয়। মিডিয়ার চাকুরেদেরই এমন বেখাপ্পা ছুটির দিন থাকে।
একটা দমকা হাওয়ায় পর্দা এলোমেলো হল। ঘরটা ভরে গেল বিদ্যুৎচমকে। মেঘ ডাকার গুমমমম ধ্বনি ভেসে এল। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটা কী দেখছি চোখের সামনে? বিদ্যুতের সাদা আলোর ঝলকানি গোটা ঘরটা দখল করে ফেললেও দরজার পাশের একটা অংশে লেগে রয়েছে অন্ধকার। সেই অন্ধকার যেন ঝুঁকে বসে থাকা মানুষেরই অবয়ব! এবং আমি তাকে চিনতেও পারছি! অস্ফুটে বলে ফেললাম, ‘মিঠু!’ মিঠু আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত।
‘চিনেছিস তাহলে।’
‘হ্যাঁ। আজ বুঝলাম, মুখ… মুখ কেন শরীরের কোনও অংশ ছাড়াও স্রেফ অবয়বে মানুষকে চিনে ফেলা যায়!’
বুঝতে পারছিলাম না, সত্যিই ঘুম থেকে উঠেছি কিনা। বুঝতে পারছিলাম না এটা আমার দিবানিদ্রারই এক সম্প্রসারণ কিনা। মিঠু যেন আমার মনে কথা পড়ে ফেলল। বলল, ‘তোর বোধহয় বিশ্বাস হচ্ছে না। তুই তো ভূতে বিশ্বাস করিস না। অথচ পনেরো বছর আগে যে মরে গেছে তাকে দেখতে পাচ্ছিস। সে যতই অন্ধকার হোক, সে তো তোর বন্ধুটাই।’
কথাটা মিথ্যে নয়। ছোটবেলায় ভূতের গল্প শুনে খুব হাসতাম। কিন্তু ভাবিনি কখনও এভাবে… পনেরো বছর আগে মিঠু নিজের বিছানায় শুয়ে হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছিল। সেই শুকনো রক্তের রঙিন হাত, আঙুল, ওর নিষ্প্রাণ কিশোরী মুখটা আজও দেখতে পেলাম। কাঁদিনি। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। তবে আজ বুঝতে পারছি পরবর্তী কোনও শোকের ভিতরে নিশ্চয়ই মিশিয়ে দিয়েছিলাম মিঠুকে হারানোর শোকটাও।
‘আজ আমার মৃত্যুদিন। জানি তোদের কারও মনে নেই। কেবল আমার মা-বাবা ছাড়া। অন্যবারের মতো আজও আমার ছবির সামনে ধুপ জ্বেলে দিয়েছে মা। পরিয়েছে রজনীগন্ধার মালা। সামনে রেখে দিয়েছে আমার প্রিয় বরফি। কিন্তু মা জানে না যা কিছু প্রিয়, তা মৃত্যুর পরে বড় পীড়া দেয়। প্রিয় খাবার বা ফুলের সুঘ্রাণ কিছুই আর শান্তি দেয় না যেন। আবার এও ঠিক, সেই পীড়া আসলে প্রবল আসক্তিরই প্রকাশ। যেমন তুই…’
‘আমি?’
‘হ্যাঁ, আমার ডায়রি ভর্তি করে তোকে চিঠি লিখতাম। তারপর তোর ইগনোরেন্স দেখতে দেখতে রেগেমেগে সেসব ছিঁড়ে ফেলে দিতাম। আজও সেসব ভাবলে অভিমান হয়, তবু দেখ, তোর কাছেই চলে এলাম।’
এ অবিশ্বাস্য। বরাবরই ভাবতাম আমরা কেবলই বন্ধু। একটা ডাকসাইটে সুন্দরী মেয়ে কেনই বা একহারা চেহারার কাউকে… অথচ মিঠু আমাকেই…! ‘তুই কি আমার জন্য…?’
‘নাহ! নির্দিষ্ট কোনও কারণ ছিল না। ওই যে কবিতায় আছে না? মরিবার হল তার সাধ। অনেকটা সেরকমই। অথবা তাও নয়। জেনেই বা কী করবি?’
‘তুই কেমন আছিস মিঠু?’
কিছুটা হাওয়া বয়ে যায়। এ কি ঝোড়ো বাতাস স্রেফ? নাকি মিঠুর… ওই থমকে থাকা ছায়ার দীর্ঘশ্বাস? তীক্ষ্ণ এক শ্বাসের মতো বেজে ওঠে মিঠুর কণ্ঠস্বর। যেন ঘুমের গোপনে ভেসে আসা অপসৃয়মাণ ট্রেনের মর্মভেদী হুইসল, ‘আমি কেবল ভেসে বেড়াই। ছায়া হই, হাওয়া হই… কখনও কিছু না হয়ে তোর কাছেও এসেছি… সাড়া দিইনি। তুই বুঝিসনি, তোর কত মনখারাপে মিশে আছে আমারই অন্ধকার, আমারই বইয়ে দেওয়া আনমনা হাওয়া। তবু চেনা দিইনি। কী এক অভিমানে কাটিয়েছি এই দীর্ঘ একলা পথ… জানি আজ আমি স্রেফ একখণ্ড অন্ধকার, তবু তারও একটা আশ্রয় লাগে শেষপর্যন্ত। আমায় থাকতে দিবি? তোর কাছে?’ তারপর সামান্য থেমে উচ্চারণ করে, ‘ভালোবাসবি?’

সেই থেকে মিঠু আমার কাছে আছে। আমার বুকের গোপনে একটা ছায়া হয়ে। কেউ জানে না। কিন্তু যখন বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ গুম মেরে যাই, যখন অফিসে কাজের ব্যস্ততা সত্ত্বেও আচমকাই নিজেকে টেনে নিয়ে যাই বারান্দার পাশের প্রবীণ পাকুড়গাছের কাছে, তখন আমি সেই অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলি। যখন সে ছিল, তাকে বুঝিনি। এখন সে কোথাও না থেকেও আছে, তীব্র ভাবে আছে। তবে কেউ তা বোঝে না। বুঝতে পারবেও না কক্ষনও। বুকের ভিতরের অন্ধকারকে কি কেউ দেখতে পায়?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top