Short Story of Biswadip Dey

কুমার শানু ও নীল নক্ষত্রের আলো —বিশ্বদীপ দে

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর। ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা।’ কোনও কারণ ছাড়াই এই সময় বুকের মধ্যে বেজে ওঠে একটা ঘ্যাসঘেসে রেডিওর সুর। অথচ কয়েক ঘণ্টার বিশ্রী বৃষ্টিতে শহরটা জলের ভিতরে লুটোপুটি খাচ্ছে। আজ বৃষ্টি নেই। বাস থেকে নেমে পাড়ায় ঢুকতেই দেখতে পেলাম পথের সামান্য উপরে আলোর চাঁদোয়া টাঙানো। গমগম করে বেজে উঠেছেন কুমার শানু। ‘আর কতকাল আমি সইব?’ বুঝলাম এটাই সেই দিন। প্রতিবারই মনে হয় এমন। কে যেন কুড়ি বছর আগের পৃথিবীতে পোর্ট করে দিয়ে যায় আমাকে।
ষষ্ঠীর সন্ধে। অফিসফেরত ক্লান্ত শরীরে আস্তে আস্তে এগোচ্ছিলাম। আমাদের বাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে মিনিট তিনেক। কিন্তু আমি আজ সেখানেই থেমে যাব না। প্রতি বছরই এই সময়টায় সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আরও কয়েক মিনিট আমি হাঁটি। কাউকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে অমলদার চায়ের দোকানে বসে দু’কাপ লাল চা খাই। সঙ্গে প্রজাপতি বিস্কুট, গোটা দুয়েক সিগারেট। অমলদা কখনও প্রশ্ন করেনি, সারা বছর আমার দেখা পাওয়া যায় না কেন। ও নিশ্চয়ই দেখেছে, বচ্ছরভর আমি চা খাই ওপাড়ার বিল্টুদার দোকানে।


অমলদার দোকানটা পাড়ার প্যান্ডেল পেরিয়ে কয়েক ফুট দূরে। আর এই দোকানের একেবারে উলটো দিকেই একটা দোতলা বাড়ি। আজ অন্য লোক, অন্য সংসার সেখানে জেগে থাকে। কিন্তু আমার চোখ এই সময় সেখানে পুরনো সময়কে বিঁধে থাকতে দেখে। নিজেকে চায়ের দোকানে বসিয়ে রেখে, আমি গিয়ে কলিং বেল বাজাই। তৃণাদের কাজের লোক এসে দরজা খুলে দেয়। উপরে উঠে দেখি নীল শাড়িতে ঝকঝক করছে তৃণার শরীর। আমাকে দেখে মুচকি হাসে, ‘জাস্ট পাঁচ মিনিট…’ আমি বাধা দিই না। ওর ঘরময় ঘুরতে থাকে। স্পর্শ করি তৃণার জীবন। এটা কবে কিনলি? ওটা কবে কিনলি?
তৃণার মা আসেন। অল্প হাসেন। রান্নাঘরে কিছু চাপিয়ে এসেছেন। তৃণার বাবা টিভি দেখছেন মন দিয়ে।
‘বেশি দূরে যাস না, কেমন?’
‘না, কাকিমা। এই সাউথেই…’
আমার থার্ড ইয়ার। তৃণার সদ্য ফার্স্ট ইয়ার। দূরে মাইকে বাজছে কুমার শানু, ‘অ্যায় রাত জারা থম থমকে গুজর…’ সেই আওয়াজ থামিয়ে ‘আজ মহাষ্টমী… সকল দর্শনার্থীদের জানাই…’ এর মধ্যেই তৃণা এসে দাঁড়ায় সামনে। ওর শরীরে আশ্চর্য গন্ধ। বুক ভরে ঘ্রাণ নিই। চোখ বুজে আসে। দেখি একটা অচেনা লাল ফুলের খেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তৃণা হাসছে। চারপাশে জ্যোৎস্না। আমি গন্ধের ক্যামোফ্লেজে তৃণাকে জড়িয়ে ধরি।
স্বপ্নের ভিতরে বলি, ‘কী মেখেছিস রে?’
‘ভালো না গন্ধটা? এটার নাম ব্রুট মাস্ক! আজ কিন্তু বাসে উঠব না। ট্যাক্সি নেব, কেমন?’ বাস্তবের পৃথিবী থেকে জবাব দেয় তৃণা। আকাশ এই রাতে স্বচ্ছ নীল। অন্তর্হিত মেঘমালা। আজ তৃণা আমার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবে! সত্যি!
আমরা ট্যাক্সি নিই। হলুদ ট্যাক্সিটা শহরের আলোমাখা হুল্লোড়ের ভিতরেও আমাদের একা করে দিতে থাকে। আমি দেখি তৃণার ঠোঁট আজ বড় বেশি রঙিন। কানের লতিতে ছোট্ট ফুল আর শরীরময় লাল ফুলের খেতের সুগন্ধ। তখনও জানি না সারা জীবন ব্রুট মাস্ক আমার চেতনায় উপুড় হয়ে থাকবে। অথচ… ওর সঙ্গে আমার একলা থাকায় বাধ সাধবে ওর ব্যাগের ভিতরে বেজে ওঠা সদ্য কেনা নোকিয়া ৩৩১০।
‘কে ফোন করেছে রে?’
‘দেখতে পাবি এখুনি।’


সেদিন আমরা তিনজনে ঠাকুর দেখেছিলাম। আমি, তৃণা আর অতন্দ্র। বছর পঁচিশের এক ঝকঝকে যুবক। দেখেছিলাম আমার পাশ থেকে অতন্দ্রর দিকে সরে যাচ্ছে আমার বান্ধবী! শহরের অলিগলিতে ওরা ঘুরতে থাকি। ভিড় ও ঘামের অস্বস্তি ছেয়ে ফেলে আমাকে। মাইকে মাইকে বাজে কত রকমের গান… আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, কুমার শানু বেজে উঠলে সব কিছু বদলে যাবে। কিন্তু সেদিন ‘হোল নাইট’ আর কিছুই আমার মনমতো ঘটেনি। ঘুরতে ঘুরতে তৃণার শরীর থেকে মুছে যাচ্ছিল ‘ব্রুট মাস্ক’… অনাঘ্রাত এক সন্ধ্যা আমাকে ক্নান্ত ভোরে পৌঁছে দিয়েছিল। ফেরার আগে তৃণা বলেছিল, ‘কাউকে আবার বলতে যাস না ওর কথা…’
আজ এতদিন বাদে একেকটা অলৌকিক আশ্বিন-সন্ধ্যায় কুমার শানু বেজে উঠলে আমি দেখতে আসি তৃণাদের বাড়িটা। ওরা তো কবেই বাড়ি বেচে যাদবপুরে চলে গেছে। তৃণার বিয়ে অবশ্য অতন্দ্রর সঙ্গে হয়নি। কিন্তু সেই বছর পঁচিশেকের যুবক ওই এক রাতেই আমাকে তৃণার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। এরপর তৃণা কোন খাঁড়ি, কোন নদী বেয়ে কোথায় যে ভেসে গেল সেই খবর আর নিতে চাইনি আমি। কেবল রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একদিন দেখলাম তৃণাদের বাড়িতে এখন অন্য মানুষ, অন্য সংসার, অন্য গল্পেরা বাসা বেঁধেছে।
অথচ এমন দিনে আমি দেখি অমলদার চায়ের দোকানের উলটো দিকে তৃণাদের বাড়িটা ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে! আমারই মতো কোনও শানু-ভক্ত মাইকে টানা বাজিয়ে যাচ্ছে লোকটার গান। ‘লড়কি বড়ি অনজানি হ্যায়, স্বপ্না হ্যায়, সচ হ্যায়, কাহানি হ্যায়…’ একটা অদ্ভুত হাওয়ায় লুটোপুটি খেতে খেতে চমকে দেখি, বাড়িটাকে কেউ উপড়ে ফেলে দিয়ে একটা অতিকায় শিশি দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। যার লেবেলটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। যেন কোনও মৃত নীল নক্ষত্র, যে নেই, কিন্তু তার আলো রয়ে গিয়েছে…
শরতের নীল আকাশে একলা একলা দাঁড়িয়ে আছে একটা অতিকায় ব্রুট মাস্ক। গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে ধরণীর বহিরাকাশে…

2 thoughts on “কুমার শানু ও নীল নক্ষত্রের আলো —বিশ্বদীপ দে”

  1. দেবাশিস দে

    খুব সুন্দর। মায়াময়। পড়তে পড়তে হারিয়ে যাচ্ছিলাম অন্য জগতে। ভালো লাগলো বেশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top