-প্রথম নীল ছবি দেখার মতো রোদ না আজ?
-হু? মানে?
-কিছু না। প্রথমবার যবে অভির বাড়িতে দেখেছিলাম এরকমই একটা রোদ ছিল। হাত পাতলে মনে হবে একটু ভারী ভারী। ক্লান্ত। অনেকটা হেঁটে এসেছে। যেন মাঝে কোনও গাছ ছিল না। নদী না। নিজের কোনও দেশই যেন নেই। আগে ছিল হয়তো, এখন আর ঢুকতে দেয় না। শিকড় খুঁজতে খুঁজতে এসে পড়েছে এখানে। মানুষের হাত-পা-মুখ ছুঁয়ে দেখছে তার মতো কার কার দেশ নেই।
-বাপরে! সেইই রোদটাকে এখনও মনে আছে তোর?
-আছে তো। হত কী, সকালবেলায় পড়া থাকত তো। পড়া মানে প্রাইভেট টিউশন। সকাল মানে এক্কেবারে সকাল। এই ধর, সাড়ে পাঁচটায় বেরোতে হত বাড়ি থেকে।
-উরিহ! অত সকালে! এখন যে এত বেলা করে উঠিস?
-উঠি। এখন সকালে উঠে কোথায় যাব? সকাল আর সকালের মতোও নেই। শুধু রাত রাতের মতো থেকে গেছে। তো ওই অভিদের বাড়ির গায়ে সাইকেলগুলো শুইয়ে রাখা থাকত। তখন যদিও আমার সাইকেল ছিল না। হেঁটে আসতাম। কাছেই। মিনিট দশের পথ। ব্রিজের গা দিয়ে এসে বাঁদিকে এসে ডানদিকে। একটা বেঁটে ছোট টিভিতে ওইসব চলত। বাইরের জানলা বন্ধ থাকত। কাকু যেতেন কারখানার কাজে। কাকিমা বাজারে। স্যর চলে যাওয়ার পর চালু। ছিটকিনি তোলা, সাউন্ড মিউট। একফালি রোদ, তখনও বিছানায়।
-জানলা বন্ধ করা থাকত না?
-অনেকদিনকার পুরনো বাড়ি তো! জানলায় জল লেগে লেগে নিচের দিকটা একেবারে ক্ষয়ে গেছে। যেখানে এসে দুটো পাল্লা মিশে যায় সেখানেও একখাবলা। সেখান থেকেই তো রোদটা ঘরে ঢুকে আসে। ঘরের ভেতর কত ধুলো ঘোরাঘুরি করে এসময় টের পাওয়া যায়। ওটাই তো রাস্তা। রোদের ভেতরে ডানা মেলে দেয় ধুলোগুলো।
-ঠিকঠিক! এমন আমিও দেখেছি!
-রোদ আমাদের প্রাইভেট টিউটর…
-এটার কী মানে হল?
-কোনও যে মানে নেই, এটাই মানে। শঙ্খ ঘোষ পড়েছিস তুই?
-না। সেভাবে না। বাবুমশাই মনে আছে। আর ওই যমুনাবতী।
-যমুনাবতীর কোন অংশটা ভালো লাগে আমার জানিস?
-কোনটা?
-ওই যেখানে বলছে যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ পথ দিয়ে/ দিয়েছে পথ, গিয়ে।
-কেন কেন! আমার তো বর্গি না টর্গি না জায়গাটা দারুণ লাগে। রেলগাড়ি ঝমঝম করে যাওয়ার মতো একটা ব্যাপার আছে।
-আছে। তবে কেউ মৃত্যু দিয়ে পথ দেখিয়ে গেল। এই পথটা ওই ঝমঝম বা ঝিকঝিকের থেকে বেশি ভালো না?
-অতশত বুঝি না। রোদ নিয়ে কী বলছিলি?
-বলছিলাম যে রোদ আমাদের প্রাইভেট টিউটর!
-সে তো বুঝলাম, কিন্তু কেন?
-কেন ঠিক জানি না। মানে বলতে পারব না। মনে হল তাই বললাম। বলতে পারিস যেহেতু সব জানলা-দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পড়েও সে এসে হাজির হল। হাজির হয়ে আমাদের পাশে বসে থাকল চুপ করে। দেখল আমাদের কাণ্ডকারখানা। আর হয়তো মনে পড়ে গেল তারও ছেলেবেলার কথা। ছাড়। আসল কথাটা হল এই, যে হাজার চেষ্টা করেও তাকে এড়িয়ে যেতে পারলাম না। ঠিক ধরে ফেলল। সেইজন্য বলা প্রাইভেট টিউটর।
-তুই কি ধরা খেয়েছিলি নাকি কোনোদিন?
-খেয়েছিলাম তো! সেই লিপিতে সিনেমা দেখতে গিয়ে, স্কুলের পথে। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম লুকিয়ে। দেখে নিয়েছিল। কাউকে অবশ্য কিচ্ছু বলেনি।
-ভালো স্যর তো! ইশকুল কাট মারলি, বলল না কিছুই!
-গাছের তলায় রোদ অল্প অল্প নড়ছে। এরকম সময় আমার একটা বইয়ের নাম মনে পড়ে খুব জানিস?
-কিন্তু রোদ নড়তে যাবে কেন বলতো?
-পাতা পাতা। দুটো পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছিল। গাছের মাথায় হাওয়া দিচ্ছিল। দুলছিল পাতা। তাই রোদ-ও।
-ওহ। এই ব্যাপার। তা বইটার নাম কী?
-রৌদ্রছায়ার সংকলন। জয় গোস্বামী।
-ওহ ওহ। সেই কবি! পাগলী তোমার সঙ্গে? তারপর বেনীমাধব? তাই তো? তারপর ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবিতে, কী যেন নাম সিনেমাটার…
-সব চরিত্র কাল্পনিক?
-হুঁ হুঁ। ওখানে ওই কোন পথ ছেড়ে আমরা যাচ্ছিলাম। তাই না?
-হ্যাঁ। হাতের পাতার মতোই গাছের পাতা। কী কাণ্ড দেখ! আবার আমরা গাছে ফিরে এলাম।
-ফিরে এলাম এমনভাবে বললি যেন গাছেই থাকি আমরা। পাখি।
-নই না? জানিস গাছ সম্পর্কে আমার জানতে ইচ্ছে করে না। মানে এটা আমগাছ, এটা পেয়ারা, তুলসী এটা…এইভাবে।
-কেন? এ তো ভালো জিনিস। জ্ঞান বাড়ে।
-পাখিদের থেকে গাছ কেউ ভালো চেনে বলে মনে হয় তোর? ওরা কিন্তু নাম জানে না এসব। কিন্তু চেনে। বাড়ি তো। পাখিদের ঘর। বৈঠকখানা।
-ওই যে পাখি এসে বসল। একটা নীল পালক দেখ খসে পড়ল নিচে।
-এই তো, দ্যাখ, কাছ থেকে দ্যাখ। এই নীল, সেই কবেকার, বালকবয়সে দেখা নীল ছবির, বালকবয়সের নীল আকাশ, আর নীলমাটির বালকবয়সি রামকিঙ্কর থেকে নেওয়া।
-চল তবে। এক কাজ করি। সেই জানলা খুলে দিই আজ।
-খুলি। দরজার সেই ছিটকিনিটাও খুলে দিই।
-ওই আমাদের দর্শক এসে পড়েছে আজ। আবার। একমাত্র দর্শক। প্রাপ্তবয়স্ক। কী নাম বল তো?
-চিনি ওঁকে। রোদ।
-চল, চালাই আবার। সাউন্ড মিউট রেখে।
নীল ছবির মধ্যে দেখা যায় অভিদের সেই পুরনো বাড়ি ভাঙা পড়ছে। দুর্বল জানলা, ছিটকিনি দেওয়া দরজা, ভাঙা পড়ছে। দু’চারটে ছবির ফ্রেম, পুরনো ক্যালেন্ডার একটা কাঁসার গ্লাস হাঁ করে চেয়ে আছে।
রোদ, আমাদের তৃতীয় দর্শক, পাশ থেকে উঠে এইবার সেখানে গিয়ে বসেছে।



