
রাস্তায় রাস্তায় বাঁশের কোলাহল, শহর ঢেকে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনে। এসবের মাঝেই প্রকৃতি আমাদের জানান দিচ্ছে… বছরের একটি বিশেষ সময়ের, বিশেষ আবেগের। অর্থাৎ দুর্গা পুজো।
কিন্তু তাতে আমার কী! আমি যে নিজেকে নাস্তিক বলে দাবি করি। আমার কাছে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরই কোনও মানে নেই বা বলা ভালো থাকা উচিত নয়। আরে বাবা সেই তো একই দশ হাতের প্রতিমা। তার পাশে সন্তানেরা,মাচো অসুর আর বেশ কিছু পশু-পাখি। এই এক জিনিসের জন্য প্রত্যেক বছর এরকম রাস্তায় ভিড় করারই বা মানে কী! বাড়িতে থেকে হুলিয়ে ছুটি উপভোগ করলেই হয়!
এ তো গেলো আমার মতো নাস্তিকতার দেবদর্শন। এমন ভাবনা কোনওভাবেই ভালো নয়। কোনও গোড়া জিনিসই যে ভালো না, তা ইতিহাস আমাদের বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে। অতএব, ওই গোড়ামি বাদ দিয়ে আমি যদি নিজের সময়ে, আমার জীবনে দুর্গা পুজোর মাহাত্ম্যর কথায় আসি, তাও একেবারে নেহাৎ কম কিছু নয়। আমার বিশ্বাস কোনও বাঙালি নাস্তিকের জীবনেই দুর্গাপুজোর মাহাত্ম্য কম নয়। এর প্রধান কারণ—অনন্ত জন্মগত পরিচয়। যেহেতু বাবা-মা হিন্দু তাই আমিও নিজেকে হিন্দু বলেই জেনেছি, একই পদ্ধতিতে চিনেছি অন্যদেরও। যুক্তি কী বলে? ভক্তি বা আস্থার বিষয়টাই কি সব? আর জীবনদর্শন?
এর পরেও পুজোর আবেগকে অস্বিকার করি কী করে! আহা, প্রিয় উৎসবের আমেজ। ঠিক এখানেই, এই কারণেই পুজোকে ভালোবাসা, পুজোকেন্দ্রীক উৎসবকে ভালোবাসা। আমার কাছে বরাবরই দুর্গাপুজো যতটা না পুজো, তার থেকে অনেক অনেক বেশি উৎসব। শুধুমাত্র আমার কাছে কেন! আমার মতো বহু মানুষের কাছেই তাই। এমন সময় আমার নাস্তিকতা উকিঁ মারে, অনেক কিছু বলতে চায়। আমি তা শুনিও। সেই জন্যই হয়তো পুজোর কোনও আচার-অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করি না।
এই যে প্রতিবার যখন আমি বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোই, পাড়ায় মণ্ডপে যাই, তখন আমার নাস্তিকতা আঘাত পায় না। দৃঢ় বিশ্বাস আমার। কারণ, উৎসবের আমেজ আমাকে আনন্দ করতে বললেও ধার্মিক হতে বলে না। বা ধরা যাক, এই যে রাস্তায় আলো লাগানো হচ্ছে বা এই আলো লাগানোর জন্যই যে হুটহাট কারেন্ট চলে যাচ্ছে, এতে কি আমার কম আনন্দ হচ্ছে! একেবারেই না। পুজোর আগে কারেন্ট গেলে নিজের মনকে বোঝাচ্ছি, “আরে বাবা পুজো আসছে যে!” ঠিক এখানেই আমার কাছে দুর্গা পুজোর মানে, আনন্দ। নাস্তিকতায় বিশ্বাসী হয়েও আনন্দ।
পুজো মানে কোনওভাবেই শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতিনীতি হতে পারে না। তাহলে প্রত্যেক বছর পুজোয় ‘জন্মগত মুসলমান’ লোকটা, আমার প্রতিবেশী লোকটা যে হিন্দুদের মতোই আনন্দ করে, দূরের কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরে, তার আনন্দটা যে কেড়ে নেওয়া হবে! সেটা যে পাপ! আরে বাবা পুজো মানে যে অনেকের কাছেই ঘরে ফেরা। তাই আবারও সেই একই কথা, নাস্তিক হয়েও দুর্গাপুজো আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানি না, তবে দুর্গোউৎসবের মানে আছে। এই মানেই জাতিকে একসাথে বেঁধে রাখে, বাঁচিয়ে রাখে।



